জাকার্তা কেন ডুবে যাচ্ছে? ঢাকার জন্য সতর্কবার্তা

.

জাকার্তা ডুবে যাচ্ছে, আশংকাজনক হারে ডেবে যাচ্ছে তার শহরের মাটি! সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী ২০৫০ সালের মধ্যেই জাকার্তার ১/৪ থেকে ১/৩ ভাগ, পানির নীচে চলে যাবে। আপনারা হয়তো ভাবছেন, এ তো জানা কথাই, বাংলাদেশসহ বহু দেশ বা শহরই তো জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের উচ্চতা বেড়ে গেলে বিপদে পড়বে! 


নাহ, জাকার্তার ডুবে যাওয়ার বা তার মাটি ডেবে যাওয়ার প্রধাণ কারণ কিন্তু সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি নয়! অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্যি যে, সমুদ্রবেষ্টিত, বহু নদী দিয়ে ঘেরা, প্রায়শই বন্যায় কবলিত জাভা দ্বীপের এই ঐতিহাসিক নগরী, জাকার্তার ডুবে যাওয়ার কারণ পানির অভাব!  


আর, এখানেই বোধ হয় আইরনিটা।

 

জাকার্তাকে এখন মোকাবেলা করতে হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের চেয়েও আরো বড় এই সমস্যাটি! জাকার্তার পায়ের নীচের মাটি ডেবে যাচ্ছে গড়ে ২৫ সেন্টিমিটারেরো বেশি প্রতি বছর, কোন কোন জায়গায় তার চেয়েও অনেক বেশি! পৃথিবীর অন্যান্য যে কোনও নগরীর থেকে জাকার্তা ডুবছে অনেক বেশি দ্রুত  গতিতে  - এছাড়াও খাবার পানির তীব্র সংকট, বায়ু-দূষণ, বন্যা, জলবদ্ধতা, প্রচণ্ড ট্রাফিক জ্যামে দুঃসহ হয়ে উঠেছে নগরবাসীর জীবন। 


ঢাকার সাথে মিল পাচ্ছেন? আমাদের আজকের এই ভিডিওটি দেখলে বুঝবেন ঢাকার সাথে আরো কত দিক দিয়ে মিল জাকার্তার। জাকার্তার মত এত দ্রুত না ডাবলেও ঢাকার মাটিও কিন্তু ডেবে যাচ্ছে প্রতি বছর আধা ইঞ্চির মত! 


জাকার্তার বর্তমান অবস্থা এতটাই খারাপ যে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট ঘোষণা দিয়েছেন,  আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই তার রাজধানী সরিয়ে নেওয়া হবে বোর্নিও দ্বীপের পূর্ব কালিমান্তানে - ক্রান্তিয় বিশাল এই জঙ্গল কেটে বানানো হবে ইন্দোনেশিয়ার নতুন রাজধানী - নুসানতারা। 


চলুন তাহলে আজকে জেনে নেওয়া যাক, ১৭ হাজারেরও বেশি দ্বীপের দেশ, সেই বিখ্যাত জাভাদ্বীপের দেশ- ইন্দোনেশিয়াকে  কেন এত তাড়াহুড়ো করে সরিয়ে নিতে হচ্ছে তার রাজধানী! 


আমরা সবুজে ঘেরা ঐতিহাসিক জাভা দ্বীপের উল্লেখ পাই  আড়াই হাজার বছর আগের বাল্মিকীর রামায়ণে। এর উত্তর-পূর্বে অবস্থিত জাকার্তার কথা শোনা যায়, প্রায় ২ হাজার বছর আগে ইন্দোনেশিয়ার প্রাচীন হিন্দু রাজত্ব সুন্দানিজদের সময়ে। পরবর্তীতে ডাচরা ১৭শ' শতাব্দীতে সেখানে উপনিবেশ স্থাপন কোরে এশিয়ার ব্যবসায়িক রাজধানী বানায় জয়াকার্তা বা এখনকার জাকার্তায় - এবং তার নাম দেয়  বাটাভিয়া। 

সেই বিখ্যাত জাকার্তার আজ কিভা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে তা  বুঝতে হলে আমাদের বেশ কিছুটা পিছিয়ে যেতে হবে। ডাচরা বাটাভিয়াকে নাকি প্রাচ্যের আমস্টারডাম বানাতে চেয়েছিল - শহর জুরে হল্যান্ড বা এখনকার নেদারল্যান্ডসের আদলে খোড়া খালগুলো পরিবহনে সুবিধা করে দিলেও আসল উদ্দেশ্য ছিল ডাচদের আলাদা করে রাখা - যাতে স্থানীয়দের তুলনায় সংখ্যায় অনেক কম  ডাচ শাসকদের  নিরাপত্তার সমস্যা না হয়।  


সেই খালগুলো একসময় দূষিত হয়ে পড়লে ডাচরা শহরের আরেক জায়গায় সরে যায় এবং পরবর্তীতে শুধুমাত্র সেসব এলাকাতেই পাইপের মাধ্যমে আধুনিক পানির ব্যবস্থা তৈরি করা হয়। আর জাকার্তাসহ জাভা দ্বীপের বেশিরভাগ স্থানীয় অধিবাসীরা? তারা  পানির জন্য নির্ভর করতেন টিউবওয়েলের উপর, বা সেই দূষিত খালের পানির উপর। এর পরে ডাচরা কিছু জায়গায় সরকারী পানির কল বসালেও তা কোনোভাবেই শহরের অধিকাংশ অধিবাসীর জন্য যথেষ্ট ছিলনা। 

  

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে প্রায় ৪ বছরের সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়া ডাচদের থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু উপনিবেশের সমাপ্তি ঘটলেও ঔপনিবেশিক চরম বৈসম্যমূলক নীতিগুলোর কিন্তু তেমন একটা পরিবর্তন ঘটেনি - দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী সামরিক শাসন, তারপরের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারগুলোরও দুর্নীতিতে ভরা গণবিমুখ নীতির ফলে বহু তৃতীয় বিশ্বের দেশের মত ইন্দোনেশিয়ার উন্নতিও ঘটেছে চরম অসমভাবে। 


লাখ লাখ মানুষ জীবিকার আশায় ভীড় করেছে রাজধানীর জাকার্তায়, কিন্তু তার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করা হয়নি। গত কয়েক দশকে জাকার্তা মহানগরের জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে, এক কোটিরও বেশি মানুষের বাস এখানে, আর তার আশেপাশের জায়গা ধরলে সেই সংখ্যা হবে তার ৩ গুণ। 


ঢাকার চেহারা বেসে উঠছে আপনাদের মনে? হ্যাঁ সেটা হওয়াই স্বাভাবিক!  


সরকারী হিসেব মতে,  জাকার্তাবাসীদের  ৬০% ভাগ মিউনিসিপ্যাল পাইপের পানি পাচ্ছেন। কিন্তু অন্যান্য বহু  রিপোর্টে দেখা যায় যে, জাকার্তার ৫০-৬০ ভাগ মানুষই এখনও ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরশীল। গরীব জাকার্তাবাসীরা পাইপের পানি না পেয়ে মাটির নীচ থেকে উঠানো পানি ব্যবহার করতে বাধ্য হন  আর ওদিকে শহরের ধনীরা এবং বিভিন্ন ব্যবসা বা কলকারখানাগুলো কেন্দ্রীয় পাইপের পানি ব্যবহার না করে  নিজেরাই যথেচ্ছভাবে ভূগর্ভস্থ পানি ওঠানোর ব্যবস্থা করে নেন। মাটির নীচ থেকে এভাবে মাত্রাহীনভাবে পানি ওঠানোর ফলে মাটির নীচের পাথর এবং পলিমাটি ধ্বসে পড়ে এবং মাটির উপরের স্তর নীচে নেমে যেতে শুরু করে - যার ফলেই ক্রমশঃ ডেবে যাচ্ছে শহরটির মাটি আশংকাজনকভাবে। 


শুধু যে মাটি ডাবছে তাই নয়, জাকার্তার উত্তরের উপকূলে ঘরবাড়ি এমনকি Ciliwung-এর মত নদীগুলোও ক্রমশ ডেবে নিচের দিকে  নেমে যাচ্ছে, এমনকি জাকার্তাকে সমুদ্র থেকে বাঁচানোর জন্য যে প্রাচীর বানানো হয়েছিল - সেটাও  ডেবে যেতে শুরু করেছে।     


সাধারণত কোন এলাকায় যখন  ভূগর্ভস্থ জলাধারগুলো থেকে পানি ওঠানো হয় সেগুলো সেগুলো আবার ধীরে ধীরে ভরে ওঠে বৃষ্টি পানি দিয়ে, কিন্তু সারা শহর জুড়ে অপরিকল্পিতভাবে বিশাল সব কনক্রিটের দালানকোঠা গড়ে ওঠায় বৃষ্টির পানি আর মাটির নীচে  পৌঁছাতেও পারেনা। 


শুধু তো তাই নয়, ওদিকে আবার জাকার্তার ভিতর দিয়ে যে ১৩ টি নদী এবং তাদের অসংখ্যা শাখা প্রশাখা বয়ে যাচ্ছে তারাও সাংঘাতিকভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে। জাকার্তা পোস্টের ২০১৮ এর একটি প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, প্রতিদিন ২৫ লক্ষ কিউবিক মিটার দূষিত বর্জ্য এসে পড়ে এই নদীগুলোতে। শুধু গার্হস্থ্য ময়লাই নয় বিভিন্ন কলকারখানার দূষিত বর্জ্যে আশংকাজনকভাবে ভরে উঠেছে নদীগুলো। একদিকে মাটির নীচে ডেবে যাওয়া,  আর আরেকদিকে ক্রমশঃ  নদীগুলো  ভরে ওঠায় জাকার্তার বিভিন্ন জায়গা প্রায়ই বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়ে যায়। ২০০৭ সালে এবং ২০১৩ সালের বন্যায় জাকার্তার  বিশাল অংশ ডুবে গিয়েছিল। 


ওদিকে আবার  জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে বৃষ্টি বা জোয়ারের সময় পানি উঠে আসে -  বানানো সেই বিশাল প্রাচীর তা ঠেকাতে পারেনা, কোনও কোনও জায়গায় সেই পানি আর সরে না। শহরের গরীব জনগণ এখন এরকম জলবদ্ধ এলাকাতেই বাস করতে বাধ্য হচ্ছেন। 


ইন্দোনেশিয়ার Bandung Institute of Technogy’s গবেষণা থেকে এখানে দেখা যাচ্ছে,  ১৯৭৭ সাল থেকে কত দ্রুত হারে ডেবে গেছে  শহরের মাটি! ২০২৫ সাল থেকে ২০৫০ এর মধ্যে উপকূলবর্তী জায়গাগুলোর বহু অংশই ৪-৫ মিটার  বা তার চেয়েও বেশি ডেবে যাবে! 


অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে এত বড় সমস্যাগুলোকে সঠিকভাবে মোকাবেলা তো করা হয়ইনি, বরং মরার উপর খাঁড়ার ঘার মত উপকূলে তৈরি হচ্ছে বিলাসবহুল আবাস বা গলফ কোর্স - জাকার্তা উপসাগরের ৫ বর্গ কিলোমিটারের চেয়েও বেশি জায়গায় কৃত্রিমভাবে জমির সম্প্রসারণ করা হয়েছে।এর সাথে আবার অন্যান্য অনেক বড় শহরের মতই জাকার্তাতেও আছে প্রচণ্ড ট্রাফিক জ্যাম, দূষিত বায়ুর প্রবল সমস্যা। ঢাকার মত এক্কেবারে ১-২-৩ নম্বরে না থাকলেও প্রথম সারিতেই থাকে জাকার্তা পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায়।   


আজকের গতিতে ডুবতে থাকলে জাকার্তার ৯৫% ডুবে যাবে ২০৫০ এর মধ্যে। এবং সে কারণেই এখন ইন্দোনেশিয়ার সরকার  ৩২ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে সরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে তাদের রাজধানী, বোর্নিও দ্বীপের পূর্ব কালিমান্তানে।  


অপরিকল্পিতভাবে বা দখলদারী করে নদী-খাল ভরে বাসাবাড়ি বানানো, জীবিকার আশায় শহরে ভীড় করা বিশাল দারিদ্রপীড়িত জনগোষ্ঠী, চারদিকে পানি দিয়ে বেষ্টিত হয়েও বিশুদ্ধ  পানির অভাব, নদীগর্ভগুলো আবর্জনায় ভরে ওঠা, বদ্ধ খাল বা অল্প বৃষ্টিতেই পানি দাঁড়িয়ে যাওয়া, বাতাসের দূষণ,অক্লপনীয় ট্র্যাফিক জ্যাম –প্রিয় দর্শক, মিল পাচ্ছেন কি আপনার পরিচিত কোন শহরের সাথে? 

সবচেয়ে বেশি দেখা ভিডিও দেখুন | Most Watched Video

?>

নিবন্ধসমূহ | Articles