এভারেস্ট কীভাবে এতো উঁচু হলো জানতে হলে ঢুকতে হবে পৃথিবীর গভীরে

.

মাউন্ট এভারেস্ট, পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ -  তিব্বতীয়রা শ্রদ্ধাভরে  ডাকে Cha-mo-lung-ma বা বিশ্ব মাতৃদেবী,  নেপালিরা ডাকে  সাগরমাথা। আজ এর  উচ্চতা  ২৯,০৩২ ফুট বা ৮,৮৪৮.৬ মিটার মানে প্রায় সাড়ে ৫ মাইলের মত উঁচু। পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু বিল্ডিং  বুর্জ খলিফাকে যদি ১০বার  -> একটার উপর আরেকটা খাড়া করে দাঁড় করিয়ে দেন তাহলে  হয়তো মাউন্ট এভারেস্টের চুড়োর কাছাকাছি পৌছানো যাবে!  

পর্বতারোহীদের জন্য আজ এই আকাশছোঁয়া সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্ট জয় করা এক বিশাল সম্মানের ব্যাপার! 

কিন্তু কীভাবে এতটা উঁচু হলো সে? 

আর তার উচ্চতা আজো কেন বেড়েই চলেছে?  কীভাবে? 

আসুন, আজকে থিংকের বন্ধু, Florida International University-র ভূতত্ত্বের প্রফেসর ড. নেপচুন শ্রীমালের সাথে আমরা জেনে নেই

- কীভাবে এরকম অকল্পনীয়ভাবে বড় হলো এই মাউন্ট এভারেস্ট? 

- তার এই উচ্চতা কী বাড়তেই থাকবে ক্রমাগত,  নাকি একদিন থেমে যাবে? 

আমরা  ‘হিমালয় কীভাবে বদলে দিল পৃথিবী’ ভিডিওতে দেখেছিলাম,  কীভাবে  প্রায় ১৩ কোটি বছর আগে,   ভারত  গন্ডোয়ানাল্যান্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে উত্তরে  ইউরেশিয়ার দিকে ছুটে আসতে শুরু করে, মাঝখানের টেথিস সাগরও  বন্ধ হয়ে যায়  ধীরে ধীরে। ভারত এসে ধাক্কা খায় ইউরেশিয় অংশের সীমানায় আজ থেকে ৫ কোটি বছর আগে। আর সেই প্রবল সংঘর্ষের  ফলেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পর্বতমালা হিমালয় এবং  তার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্ট।   

এই ভয়ংকর ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন থেকে কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল এভারেস্টের মত আকাশছোঁয়া পাহাড় তা বুঝতে হলে আমাদের  বিস্তীর্ণ হিমালয় পর্বতমালার  উপরে নয় বরং আমাদের ঢুকে যেতে হবে এর ভিতরে, ঢুকে যেতে হবে পৃথিবীর গভীরে - ভূতাত্ত্বিকদের সাথে  বুঝে নিতে হবে  এই অঞ্চলে  পাত সঞ্চালনের সময় ঘটা বেশ কিছু ব্যাপার। 

থিংকের পাত সঞ্চালনের ভিডিওতে আমরা দেখেছিলাম আমাদের পৃথিবীর এক্কেবারে  ভিতরে কেন্দ্র বা কোরের উপরে থাকে  ভূ-আচ্ছাদন বা ম্যান্টল। এক্কেবারে ওপরের দিকের  কঠিন অংশটা  লিথোস্ফিয়ার বা অশ্মমণ্ডল, যা বেশ কয়েকটা টুকরোয় বিভক্ত এবং এর নিচেই আছে অল্প-গলিত  স্তর এস্থেনোস্ফিয়ার। সেদ্ধ ভাঙা ডিমের খোসা যেমন করে  ডিমের গায়ে লেগে থাকে ঠিক তেমনি ওই অশ্মমণ্ডলের  টুকরো টুকরো পাতগুলোও  ঢেকে রাখে আমাদের পৃথিবীকে।  এই কঠিন পাতগুলো এস্থেনোস্ফিয়ারের উপরে  অনবরত সরছে, প্রতি নিয়ত বদলে দিচ্ছে আমাদের পৃথিবীটাকে। 

আমাদের ভারতীয় পাতটা তৈরি হয়েছে ভারতীয় মহাদেশ এবং আশেপাশের সাগর মিলে। 

ভারতীয় পাতের সাথে  ইউরেশীয় পাতের সংঘর্ষের সময় মহাদেশীয় পাতগুলো হালকা শিলায় তৈরি বলে, অশ্মমণ্ডলের উপরের  পুরু ভূত্বক ওপরে উঠে আসে ->আর ওদিকে  সামুদ্রিক ভূত্বক ভারি শিলায় তৈরি বলে তারা ঢুকে যায় নীচের দিকে। এই সংঘর্ষ কিন্তু এখনো ফুরোয়নি, ভারত এখনো প্রায় পাঁচ সেন্টিমিটার বেগে উত্তরের দিকে এগোচ্ছে এবং ইউরেশীয়  পাতটাকে সমানে ধাক্কা দিয়ে চলেছে। 

ভারতীয় পাতের  সামনের দিকের এই  সংঘর্ষের ফলে খণ্ডিত শিলাস্তরগুলো ক্রমাগতভাবে  ভাঁজ হয়ে যাচ্ছে আর সে সাথে  বড় বড় ফাটল তৈরি হয়ে এক খণ্ড আরেক খন্ডের ওপরে উঠে যাচ্ছে। ভাঁজ আর শিলাস্তরগুলোর পারস্পরিক এই আরোহণের ফলে হিমালয়ের ভূত্বক সাধারণ ভূত্বকের তুলনায় প্রায় দুই গুণ পুরু হয়ে গেছে। আর এই এই কারণেই প্রতি বছর এভারেস্ট -> গড়ে এখনো ১.৪ মিলিমিটার করে উঁচু হচ্ছে।

কিন্তু ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে আবার দেখা যাচ্ছে যে,  হিমালয়ের নিচের অংশটা বা ভূত্বক,  ভারতীয়-গাঙ্গেয় সমতল থেকে দক্ষিণ তিব্বত অবদি আস্তে আস্তেই পুরু হয়ে উঠছে - আলাদা করে যে...  শুধু এভারেস্টের নিচেই মহাদেশীয় ভূত্বক আচমকা পুরু হয়ে এভারেস্টের উচ্চতা এভাবে বাড়াচ্ছে  - এরকম কোনো প্রমাণ কিন্তু  পাওয়া যায়নি। 

তাহলে হিমালয় পর্বতমালায় শুধু মাউন্ট এভারেস্টেরই এই বিশাল উচ্চতার ব্যাখ্যা কী? 

জবাবটা লুকিয়ে আছে এভারেস্টের নিচে উত্তপ্ত বা গলিত শিলার উপস্থিতির ভেতরে। 

পৃথিবীর আভ্যন্তরীণ তাপের কারণে শিলাস্তূপের নিচের দিকে ক্রমাগত উত্তপ্ত হতে থাকে এবং একসময় তা গলতে শুরু করে। এই উত্তপ্ত এবং স্বল্প গলিত অংশটা হালকা হওয়ায় ওপরের শিলাস্তূপটা ক্রগতভাবে ঠেলে ভূত্বকের ওপরে উঠে আসতে চায়। এভারেস্টের নিচের দিকে বেশ কমবয়েসি আগ্নেয় গ্রানাইট শিলা দেখে বোঝা যায়, কয়েক কোটি বছর আগেও এভারেস্টের তলায় প্রচুর পরিমাণে গলিত শিলা ছিল এবং ->হয়তো এখনো আছে। 

তাই প্রাচীন সংঘর্ষের সেই ধ্বংসস্তূপ, উত্তপ্ত এবং হালকা শিলার স্তর এবং ঊর্দ্ধমুখী গলিত শিলা বা ম্যাগমার চাপ - এই তিনটে ফ্যাক্টর মিলে মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতাকে ব্যাখ্যা করা যায়। হিমালয়ের অন্য কোথাও হয়তো এভাবে এই তিনটের সম্মেলন ঘটেনি।  

একটু আগে যে বললাম,  ভারত এখনো ইউরেশিয়ার পাতটাকে সমানে ধাক্কা দিতে দিতে  প্রায় পাঁচ সেন্টিমিটার বেগে উত্তরের দিকে এগোচ্ছে! ধাক্কায় পর্বত যেমনি বাড়ছে, তেমনি হিমবাহ, নদী, বাতাস, আর ভূমিধ্বসে ক্রমাগত ক্ষয়ও  হচ্ছে। যত দ্রুত পর্বত উঁচু হয় তত দ্রুতই এর ক্ষয়ও হয়। এভারেস্ট সহ হিমালয়ের বিপুল উত্থান  বিপুল পরিমাণ ক্ষয়ের কারণ হয়েছে আর সেই ক্ষয় হওয়া পলিমাটি  নদীপথে বয়ে এসেই জন্ম দিয়েছে বাংলাদেশের বেশিরভাগ আর পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ অংশের।। 

কীভাবে জন্ম নিয়েছিল আমাদের এই বদ্বীপ তা নিয়ে আরেকটি ভিডিওতে বিস্তারিত আলোচনার ইচ্ছে রইলো।  

তাহলে  এখন প্রশ্ন হচ্ছে, হিমালয় এবং এভারেস্ট পর্বতশৃংগ কি এভাবেe উঁচু হতেই থাকবে ? থামবেনা? 

নাহ থামবে...

পৃথিবীর প্রাচীন পর্বতগুলো যেমন ধরুন ভারতের আরাবল্লী পর্বতমালা, উত্তর আমেরিকার আপ্পালাচিয়ান বা এমনকি আল্পসের পর্বতমালাও এককালে হিমালয়ের মতন বিশাল ছিল -> কিন্তু আজ তারা ক্ষয়িষ্ণু -> ক্রমশঃ ক্ষয়ের ফলে ছোট হয়ে আসছে। দুটো পাতের সংঘর্ষের ফলে প্রথমে পাহাড়গুলো দ্রুত  বড় হতে থাকলেও একসময় কিন্তু তা বন্ধ হয়। তাই হিমালয় পর্বতমালার এই উঁচু হতে থাকার প্রক্রিয়াও এক সময় শেষ হবে, তখন অন্যান্য পর্বতমালাগুলোর মত তারো শুধুই ক্ষয় হবে -  উচ্চতাও কমতে শুরু করবে। 

ধীরে ধীরে ক্ষয়ে গিয়ে নিজের প্রতিচ্ছবি হয়ে থেকে যাবে একদিন - প্রকৃতির এইই নিয়ম - তার এই ভাঙ্গা-গড়া চলতে থাকে প্রতিনিয়ত! 


সবচেয়ে বেশি দেখা ভিডিও দেখুন | Most Watched Video

?>

নিবন্ধসমূহ | Articles