চালকবিহীন গাড়ি | চালকবিহীন গাড়ির টেকনোলজি

.
গাড়ি চালানোর সময় আপনি সবচেয়ে বেশি কীসের উপর নির্ভর করেন? যা ঠিক থাকলে কোন দুর্ঘটনা ঘটবেনা?  হাজার হাজার মানুষ প্রতি বছর সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যাবেনা? সেটি কী গাড়ির ব্রেক? না এয়ারব্যাগ? না বোধহয়। টায়ার? গাড়ির সবচেয়ে আসল ঘটনাটি হলো আমি বা আপনি অর্থাৎ গাড়ির চালক।


বেশিরভাগ সময়ই চালক ঠিক তো গাড়ি ঠিক। সবকিছু ঠিক। শতকরা ৯৪-৯৯ ভাগ দূর্ঘটনাই নাকি সরাসরি চালক দ্বারা ঘটে। গাড়ি সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে চালকই সবচেয়ে বড় সমস্যা। বলতে পারেন, সিস্টেমের মধ্যে সবচেয়ে বড় গন্ডগোল হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে। মজার বিষয় হচ্ছে, খোদ গাড়ির জনক কার্ল বেঞ্জ যেদিন প্রথম মানুষজনের সামনে তার গাড়ির প্রথম প্রদর্শনী করতে গিয়েছিলেন সেদিনই তিনি দূর্ঘটনা ঘটিয়েছিলেন।

বানিয়ে বলছিনা, সত্যি সত্যি! তিনি গাড়ি নিয়ে দিব্যি একটি দেয়ালের মধ্যে ধাক্কা দিয়েছিলেন। কিন্তু এ আধুনিক বিশ্বে গাড়ি ছাড়া তো আমাদের আর চলছেনা। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ গাড়ি দূর্ঘটনায় আহত বা নিহত হলেও আমরা নিরূপায়। গাড়ি ছাড়া আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রা, স্কুল, কলেজ, ব্যাবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি সবই থমকে দাঁড়াবে। তাই প্রথম থেকে গাড়ির দূর্ঘটনা নিরসনের জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা চলছে, ভারী ও টেকশই উপাদানের ব্যবহার, গাড়ির মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ আসনগুলোর জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি, সিট বেল্ট বানানো থেকে শুরু করে আধুনিক প্রযুক্তির Rear view ক্যামেরা, সেন্সরের ব্যবহার এবং ট্রাফিক নিয়মের উন্নতি পর্যন্ত কী না করা হয়েছে! কিন্তু তারপরেও দূর্ঘটনা বা ঝুঁকির হার তেমনভাবে কমছেনা কারণ শেষ পর্যন্ত গাড়ির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণটাই থাকছে সেই চালকেরই হাতে।
তাহলে ব্যাপারটা কী? ব্যাপারটা এই দাঁড়াচ্ছে যে দূর্ঘটনা, ক্ষয়-ক্ষতি এবং মৃত্যুর হারে যুগান্তরকারী পরিবর্তন আনতে হলে সিস্টেমের মূল সমস্যা চালকের হাত থেকে, মানে, আমাদের নিজেদের হাত থেকেই নিজেদের মুক্তি পেতে হবে। এতে দূর্ঘটনায় মৃত্যুর হার যে কমবে শুধু তাই নয়। হিসেব করে দেখা যাচ্ছে, ট্রাফিক জ্যাম ও দুষণ প্রতিরোধেও বিশাল পরিবর্তন সাধন করা সম্ভব। যদিও পুরোদমে গবেষণা চলছে, বিভিন্ন পরীক্ষামূলক প্রকল্পের কথাও শোনা যাচ্ছে অহরহ, কিন্তু সব দেখেশুনে মনে হচ্ছে দিল্লি এখনো বেশ দূরে! 


বেশকিছুদিন ধরে নাম করা অটোমোবাইল কোম্পানিগুলো ব্যবসায়ীকভাবে বাজারে চালকহীন গাড়ি আনার কথা বলছে। টেসলা ঘোষণা দিয়েছিল, ২০১৬ সালের মধ্যে তারা নিউইয়র্ক থেকে লস এঞ্জেলেস পর্যন্ত চালকহীন গাড়ি চালাতে পারবে কিন্তু এখনো তা সম্ভব হয়নি। কেনো চালকবিহীন গাড়ি তৈরি এতটা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে তার কারণ বুঝতে হলে এর নির্মাণ প্রকৌশল এবং একে নিরাপদভাবে রাস্তায় নামাতে হলে কী কী করা দরকার সেটা বুঝতে হবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সোসাইটি অব অটোমোটিভ ইঞ্জিনিয়ার বলছে, স্বয়ংক্রিয় গাড়ির ছয়টা স্তর রয়েছে। সহযভাবে বোঝাতে গেলে, শূন্যস্তর, মানে হচ্ছে, গাড়িটাতে কোনোই অটোমেশন থাকবেনা এবং পঞ্চম স্তরের গাড়ি হলো সম্পূর্ণভাবে চালকবিহীন গাড়ি যার কোন স্টিয়ারিং হুইল বা প্যাডেলেরও দরকার হবেনা। তাহলে এ ৫ টি স্তর আসলে কী কী? প্রথম স্তরের গাড়ীতে কেবল স্বয়ংক্রিয় একটা ব্যবস্থা থাকে মার্সিডিজ ব্রেঞ্জার স্ট্রাস, এর ডিস্ট্রোনিক সিস্টেমে একটা রাডার ব্যবহার করা হয়েছে, যা যেকোন মুহূর্তে অন্য গাড়ির সাথে এর দূরত্ব বলে দিতে পারে। দ্বিতীয় স্তরের উন্নত প্রযুক্তির সেন্সরগুলো চারপাশ সম্পর্কে আপনাকে এতটাই ভালো ধারণা দিয়ে দিতে পারে যে আপনি অনায়াসে অনেক জটিল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। টেসলা অটোপাইলট অথবা নিশান লিফের প্রো-পাইলটের মতো গাড়িগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে হাইওয়েতে লেন পরিবর্তন বা পার্কিংও করতে পারে। কিন্তু তারপরেও এরা কোনভাবেই চালকবিহীন নয়। তৃতীয় স্তরের গাড়িগুলোতে বড় ধরণের প্রযুক্তিগত উত্তরণ ঘটেছে। এ গাড়িগুলো চালক ছাড়াই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। গাড়ি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলার সুযোগে আপনি একটা মুভিও দেখে নিতে পারেন। তবে অসুবিধা একটাই। প্রয়োজন পড়লে আপনাকে অর্থাৎ গাড়ির চালককে নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে, দশ সেকেন্ডের মধ্যেই । ২০১২ সালে বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আসে তৃতীয় স্তরের প্রথম গাড়ি Audi A8। চতুর্থ স্তরের গাড়িগুলো একদম সায়েন্স ফিকশনের মতো। এতে আপনি দিব্যি ঘুমিয়ে পড়তে পারেন। গুগলের ওয়েমো ব্র‍্যান্ডের গাড়িগুলি প্রযুক্তিগতভাবে এই স্তরের। তারা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়। কিন্তু খুব নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে শুধু তারা চালাতে পারে।



পঞ্চমস্তরের গাড়ি হলো সেই স্বপ্নের গাড়ি যা সম্পূর্ণ চালকবিহীন। এগুলো এতটাই উন্নত হবে যে আপনি বরং যদি চালাতে যান তাহলেই দূর্ঘটনা ঘটবে। Uber বা লিফটের মতো এপ দিয়ে এ গাড়িগুলো ব্যবহার করতে পারবেন চালক ছাড়াই, অদূর ভবিষ্যতেই। দ্বিতীয় ও তৃতীয়স্তরের গাড়িগুলো এখনই কিনতে পাওয়া যায়। কারণ প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য গত পাঁচ বছরে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু এ গাড়ির কোম্পানিগুলো বারবার চতুর্থ ও পঞ্চম পর্যায়ের গাড়ির কথা বলেও পিছিয়ে যাচ্ছে। এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যাটা হচ্ছে, চালকবিহীন গাড়ি রাস্তায় চলার সময়,বিচিত্র যে সব পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়, সেসব নিরাপদে মোকাবিলা করতে না পারা, গাড়ির আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখনো সব ধরণের অপ্রত্যাশিত মুহূর্তের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্য প্রস্তুত হয়নি।


সমস্যা হলো, মানুষ যেমন তার সহযাত বুদ্ধি দিয়ে, বহু অপ্রাত্যাশিত পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা স্বয়ংক্রিয় গাড়িকে ঠিক সেভাবে এখনো প্রশিক্ষণ দেয়া যাচ্ছেনা। ধরুন, একটা স্টপ সাইন। কেউ হয়তো গ্রাফিতি বা রঙ দিয়ে একে প্রায় ঢেকে ফেলেছে, আপনার আমার হয়তো সেটা চোখে পড়বে এবং কিছুটা ইতস্তত করে হলেও, আমরা থামবো। কিন্তু স্বয়ংক্রিয় গাড়িতো তা পারবেনা। গুগলের চালকবিহীন গাড়ি Waymo একবার রাস্তায় থেমে গিয়েছিল। কেনো জানেন? কারণ এক বৃদ্ধা বড় রাস্তাটার মাঝখানে হাতের লাঠি দিয়ে একটা হাঁস তাড়াচ্ছিল। ভেবে দেখুন, আমাদের দেশের মতো রাস্তায়, যেখানে গরুর গাড়ি, ঠেলা গাড়ি, রিক্সা, এমনকি গরু ছাগলও চলে সেখানে কী অবস্থা হবে এ স্বয়ংক্রিয় গাড়িগুলোর। এ অপ্রত্যাশিত অবস্থার অনেককিছুর জন্য কিন্তু মানুষই দায়ী। আমরা অনেক উল্টাপাল্টা কাজ করি, আমাদের আচরণ আন্দাজ করা কিন্তু বেশ কঠিন। আমরা যেভাবে গাড়ি চালাই বা রাস্তায় হাঁটাচলা করি বা গাড়িকে নিজের মতো করে সাজাই, অকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পক্ষে সেটি বোঝা খুবই কঠিন। ( এখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হবে !)


চালকহীন গাড়ি প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর এখন যা দরকার তা হল লক্ষ লক্ষ মাইল গাড়ি চালিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এমন সব কোটি কোটি অপ্রত্যাশিত মুহূর্তের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া। কিন্তু সেটা ভীষণ ব্যায়বহুল একটি প্রকল্প।তাহলে কি আশা নেই? এর একটা সমাধান হয়তো সিমুলেশন। কোম্পানিগুলো এখন তাই করছে।


আসল রাস্তার একদম অবিকল প্রতিরুপ তৈরি করে সেখানে তাদের চালকবিহীন গাড়িগুলোকে পরিচালনা করছে। এবং রাস্তায় সত্যিকারের যে অপ্রত্যাশিত মুহূর্তগুলো তৈরি হতে পারে, সেগুলো মোকাবিলা করার পদ্ধতি শেখাচ্ছে। সিমুলেশনের মাধ্যমে এ প্রশিক্ষণগুলো অপেক্ষাকৃত স্বস্তা ও নিরাপদ এবং দ্রুততর। কিন্তু বাস্তবজগতের পরীক্ষা ও অভিজ্ঞতার সাথে কী আর এসবের তুলনা চলে? নিরাপত্তার কারণে চালকহীন গাড়ি এখনো বৈধতা না পেলেও, আজকাল স্বয়ংক্রিয় গাড়ি যাতে বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারে সেজন্য বেশকিছু সুযোগ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। যেমন ধরুণ- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বা সিঙ্গাপুরের মতো দেশে কিছু নির্দিষ্ট নিয়মনীতি মানলে আপনি চতুর্থস্তরের গাড়ী নিয়ে রাস্তায় পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতে পারবেন। তবে এটা বোঝা যাচ্ছে গাড়ির সবচেয়ে বড় সমস্যা চালক বোধহয় চিরদিন আর সমস্যা হয়ে থাকবেনা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কবে হবে সেটা?


ধীরে ধীরে হলেও আমরা ক্রমশ স্বয়ংক্রিয় গাড়ির দিকেই এগিয়ে যাচ্ছি। হয়তো অচিরেই আমরা গাড়িতে বসে, ড্যাসবোর্ডের উপর পা তুলে দিব্যি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেশের এ মাথা থেকে ও মাথায় পৌঁছে যেতে পারবো, নিরাপদে ও চালক ছাড়াই।

সবচেয়ে বেশি দেখা ভিডিও দেখুন | Most Watched Video

?>

নিবন্ধসমূহ | Articles