ক্রিস্টোফার কলম্বাস একজন বিখ্যাত পর্তুগিজ নাবিক, ১৪৯২ সালে আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কার করে মানব সভ্যতাকে উপহার দিয়েছেন সম্পূর্ণ নতুন এক পৃথিবী বা নিউ ওয়ার্ল্ড ছোটবেলায় ঠিক এরকমটাই পড়েছি আমরা, কিন্তু আসল সত্যিটা কতাই? উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় এবং ইউরোপে তাঁর নামে রাখা হয়েছে রাস্তা, শহর, রাজ্য, দেশের নাম, বানানো হয়েছে হাজারো ভাস্কর্য। আমেরিকায় তাঁর নামে ১২ই অক্টোবর ছিল জাতীয় ছুটির দিন। তাঁকে এতদিন ইতিহাসের বিশেষ একজন হিরো হিসেবেই গণ্য করা হয়ে এসেছে।কিন্তু তিনি কি আদৌ এক মহান ব্যক্তি ছিলেন যাকে আমাদের পুজোর বেদীতে উঠিয়ে রাখা উচিত? বেশি দূর যেতে হবে না, স্বয়ং ক্রিস্টোফার কলম্বাস, তার ভাই এবং সে সময়ের খৃষ্টান ধর্ম যাজক Bartolomé de las Casas লেখা ডায়েরি থেকেই আমরা এখন কলম্বাসের জীবন এবং কৃতকর্ম সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাচ্ছি। এর সাথে ঐতিহাসিক এবং প্রত্নতত্ববিদদের গত কয়েক দশকের গবেষণা তো আছেই, এখন আবার যুক্ত হয়েছে জেনেটিসিস্টদের প্রাচীন ডিএনএ বিশ্লেষণ - যা থেকে সারা বিশ্ব উপলব্ধি করতে শুরু করেছে যে-কলম্বাস সম্পর্কে আমাদেরকে যা জানানো হয়েছে তার বেশিরভাগই ভুল।
চলুন তাহলে আজকে থিংকের এই ভিডিওতে জানা যাক, কলম্বাস কি সত্যিই একজন বড় অভিযাত্রী বা আবিষ্কারক ছিলেন? নাকি ছিলেন একজন অত্যাচারী, লোভী, নির্মম এক ব্যবসায়ী যিনি উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকার হাজার হাজার বছরের পুরনো সভ্যতা এবং আদিবাসীদের উপর অকথ্য অত্যাচার, খুন, ধর্ষণ এবং নির্মূলের জন্য দায়ী? ১৪৯২ সালে কলম্বাস যখন, এশিয়ার বা ইন্ডিজের খোঁজে, আটিলান্টিক মহাসাগরে যাত্রা শুরু করার পরিকল্পনা করেন তখন অনেকেই তাঁকে পাগল ভেবেছিল - কে অজানা অথই মহাসমুদ্র বেয়ে পশ্চিমে যায় পুবের খোঁজে? অনেক সাধ্য সাধনার পর, কলম্বাস স্পেনের ক্যাস্তিল এবং আরাগনের কূটবুদ্ধিসম্পন্ন রাজা দ্বিতীয় ফার্ডিনান্ড এবং অত্যন্ত ধার্মিক খৃষ্টান রানী ইসাবেলার পৃষ্ঠপোষকতা পান। কোন কিছু আবিষ্কারের লক্ষ্যে তাঁরা এই যাত্রা করেননি - উদ্দেশ্য ছিল একটাই - কীভাবে যে কোন মূল্যে এশিয়ার সিল্ক, সোনা, মসলার বাণিজ্যের জন্য সরাসরি পথ বের করে ধনী হওয়া যায়।
এর আগে স্থলপথে ভারত, চিন, এবং এশিয়ার অন্যান্য দেশের সাথে বাণিজ্যের ঐতিহাসিক সেই, সিল্ক রোড, এবং রেড সি বা লোহিত সাগর মুসলমান অটোমান রাজত্বের হাতে চলে গেছে। তাই ইউরোপের উদীয়মান পুঁজিবাদী দেশগুলো তখন হন্যে হয়ে জলপথে ভিন্ন আরেক পথ খুঁজে বেড়াচ্ছে। পুঁজিবাদের বিকাশের শুরুর দিক তখন, পর্তুগিজ নাবিকেরা আফ্রিকা হয়ে দূরতর সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে ভারতে পৌছানোর উন্নত প্রযুক্তিও আবিষ্কার করতে শুরু করেছে। পৃথিবী যে গোল তা মোটামুটিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলেও ভাবা হতো ইউরোপ-আফ্রিকার পশ্চিমে এই মহাসমুদ্র পাড়ি দিতে পারলেই ওপারে ইন্ডিজে পৌঁছানো যাবে। এর মাঝে যে এত বড় দুটি অজানা মহাদেশ আছে সে সম্পর্কে তখন কোন ধারণাই ছিল না।
কলম্বাস তাঁর তিনটি জাহাজ এবং নাবিকদল নিয়ে যাত্রা করলেন প্রথমে দক্ষিণ-পশ্চিমে ক্যানারি আইল্যান্ডের দিকে। ভুল করে নয় বরং তখনকার ম্যাপ অনুযায়ী ভাবা হতো সূর্যাস্ত এবং নর্থ স্টার বা ধ্রুবতারা অনুসরণ করে পশ্চিমে যাত্রা করলেই পৌঁছানো যাবে সিপাঙ্গু বা জাপানে।প্রায় দুই মাসের বেশি সময় ধরে স্থলের সন্ধান না পেয়ে সবাই যখন হতাশ তখনি তারা দূরে মাটি দেখতে পান। ১৪৯২ সালের ১২ই অক্টোবর তারা এখনকার বাহামা দ্বীপপুঞ্জের এক দ্বীপে অবতরণ করলেন। তাঁদের সাথে সাক্ষাৎ হলো আরাওয়াক গোত্রের আমেরিকান আদিবাসীদের সাথে যাদেরকে ভুল করে ইন্ডিয়ান বা স্প্যানিশে ইন্দিওস নামও দেওয়া হলো এবং অবতরণের জায়গার নাম দেওয়া হল স্যান সালভাদোর।কলম্বাস তাঁর ডায়েরিতে লেখেন যে, আদিবাসীরা দেখতে সুন্দর, অতিথিবৎসল এবং অত্যন্ত সরল যাদেরকে৫০ জন স্প্যানিয়ার্ড অনায়াসেই দাস বানিয়ে খৃষ্টান ধর্মে দীক্ষিত করে ফেলতে পারবে।
তিনি সোনার আশায় এসেছিলেন, কিন্তু এখনকার হাইতি, হিস্পানিওলা এবং কিউবার কোথাও তেমন সোনা মেলেনি। মেলেনি ইন্ডিজের সেই মশলা, বা দামি কাপড়ের মত দুর্মূল্য জিনিসপত্র। প্রথমবার যাত্রার পর স্পেনে ফিরে কলম্বাস ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে স্পেনের রাজারানিকে জানালেন, এই ইন্ডিজে রয়েছে প্রচুর উর্বর জমি, সোনার খনি, মশলার পাহাড়,তাই দরকার আরো অভিযান!দ্বিতীয় অভিযানে বা হামলায় তিনি পেয়ে গেলেন ১৭খানা জাহাজ, প্রায় বারোশো লোকলস্কর। উদ্দেশ্য দুটি: দাস ও সোনা। সোনা তেমন পেলেন না কারণ এই দ্বীপগুলোর ছোট ছোট নদীতে কিছু সোনার ধুলো ছাড়া তেমন কোনো সোনার অস্তিত্বই ছিল না। তাই দাস হিসেবে নেওয়ার জন্যে প্রায় ১,৫০০ আদিবাসী নারী, শিশু, ও পুরুষ ধরে আনা হল । তাদের মধ্যে বেছে বেছে সেরা ৫০০জনকে তোলা হল জাহাজে। এই আদিবাসীদের মধ্যে ইউরোপীয় রোগজীবাণুর প্রতিরক্ষা না থাকায় পথেই মারা গেল প্রায় ২০০জন।কলম্বাসের সহচর পাদ্রী কাসাস লিখে গেছেন কলম্বাসের ও স্প্যানিয়ার্ডদের নৃশংসতার বিবরণ। তিনি জানাচ্ছেন, ছুরির ধার পরখ করার জন্যে স্প্যনিয়ার্ডরা খেয়াল খুশি মত আদিবাসীদের গা ফালি ফালি করে কেটে ফেলত এবং ছুরি ঢুকিয়ে দিত তাদের দেহে। তারা পালাত, কিন্তু কুকুর দিয়ে তাদের ধরে আনা হত। পিষে মারা হত খনিতে, পাহাড়ে, ও নদীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ সোনা খুঁজে এনে দিতে পারলে। নীরিহ আদিবাসীদের উপর অকথ্য নির্যাতন, ধর্ষণ, খুন-জখম হয়ে ওঠে নিত্য দিনের ঘটনা। মায়েরা হতাশা ও আক্ষেপে নিজেদের সন্তানদেরও জলে ডুবিয়ে মারতে শুরু করেন।
জীবন এমনই দুর্বিষহ হয়ে ওঠে যে ৫০ হাজারেরও বেশি আদিবাসী আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। কলম্বাসের আগমনের মাত্র ৫০ বছরের মধ্যে আদিবাসীদের সংখ্যা ৩ লাখ থেকে কমে ৫০০-তে নেমে আসে। কলম্বাস শুধু আদিবাসীদের উপরই অমানবিক নিষ্ঠুরতা দেখাননি স্প্যানিয়ার্ডদের সাথেও চরম বর্বরতার পরিচয় দিয়েছেন।এত কিছুর পরেও খুব বেশি সোনা মিলল না। ওদিকে আবার দ্রুতই পর্তুগিজ, ফরাসি, ডাচ, ব্রিটিশরাও উপনিবেশ স্থাপন করতে শুরু করে দেয় উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে। স্প্যানিয়ার্ডরা এদের সাথে লড়াইতে পিছিয়ে পড়তে শুরু করে। কলম্বাস: হিজ এন্টারপ্রাইজ বইতে হ্যান্স কোনিং বলেন, “...আর শেষমেশ (স্পেনে) পড়ে রইল প্রাণঘাতী এক মুদ্রাস্ফীতি, ক্ষুধার্ত এক জনগোষ্ঠী, আরো ধনবান ধনী, আরো দরিদ্রপীড়িত গরিব এবং উচ্ছন্নে-যাওয়া এক কৃষক গোষ্ঠী।” অন্যান্য ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো এগিয়ে যেতে থাকে। ইউরোপীয় রোগজীবাণুর প্রতিরক্ষা ক্ষমতা বেশি থাকায় আফ্রিকানদের ধরে নিয়ে আসা শুরু হয় দাস হিসেবে চিনি, তামাক, নীল বা তুলার মত লাভজনক পণ্যের চাষাবাদের জন্য। কয়েক শ' বছরে লাখ লাখ কৃষ্ণাঙ্গকে দাসত্বের ঘৃণ্য শৃঙ্খলে বন্দী করা হয় আর চলতে থাকে আদিবাসীদের ওপর হামলা, জবরদখল, জোর করে খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত করা থেকে শুরু করে খুনজখম, নির্বিচার গণহত্যা।
কলম্বাসের মতন একই কাজ করেছিল পিজ্জারো পেরুর ইনকাদের সাথে, কর্তেজ মেক্সিকোরকোর আজটেকদের সাথে, এবং ইংরেজ ঔপনিবেশিকেরা আমেরিকার ভার্জিনিয়া আর ম্যাসেচুসেটস-এর পোওহাটন আর পিকোয়েটদের সাথে। পুঁজিবাদের বিকাশের প্রাথমিক মূলধন মূলত তৈরি হয় এই উপনিবেশ, দাসত্ব এবং নির্মম অত্যাচারের মধ্য দিয়েই। দখলদারদের ইতিহাসে তারাই বীর। মুছে গেছে আসল ভূমিপুত্রদের নাম ও নিশানা। বিলুপ্ত হয়ে গেছে বহু আদিবাসী গোত্র - আর যাঁরা টিকে গেছেন তাঁরা এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন সেই নির্যাতনের ফল। সাম্প্রতিককালে এই অঞ্চলের পূর্বসুরীদের প্রাচীন ডিএনএ বিশ্লেষণ থেকে দেখা যাচ্ছে যে -> কাসার দেওয়া হিসেব মত ক্যারিবিয় দ্বীপপুঞ্জে ৩০-৪০ লক্ষ আদিবাসী হয়তো বাস করতেন না, আবার আদিবাসীদের নির্মূল করাকে ন্যয্যতা দিতে জন লকদের মত এনলাইটেনমেন্টের দার্শনিকরা যে লিখে গেছেন এ অঞ্চলে খুব কম মানুষের বাস ছিল তাও ঠিক নয়। এখানে ->কয়েক লাখ আদিবাসীর উন্নত এক সভ্যতা বিরাজ করছিল। কলম্বাস এবং ইউরোপীয়দের উপনিবেশ স্থাপনের পরপরই তারা বিলুপ্ত যেতে শুরু করে।
কলম্বাস অসীম সাহস নিয়ে নতুন বা অজানার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন কিন্তু তারপরো এটা অস্বীকার করার উপায়ই নেই যে লোভ, লালসা, নিপীড়ন, বর্ণবাদ, গণহত্যা এবং অমানবিকতার চরম রূপ দেখিয়ে গেছেন কলম্বাস এবং তার পরবর্তী ঔপনিবেশিক শক্তিরা। ইতিহাসে বারবারই দূর্বল আদিবাসী এবং সংখ্যালঘুরা এরকম নির্যাতন, উচ্ছেদ এমনকি বিলুপ্তির শিকার হয়েছেন এবং এখনো সেই প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে বহু জায়গাতেই - আমাদের দেশগুলোও তার ব্যতিক্রম নয়। কলম্বাসকে বীরের আসনে বসানোটা তাই আমাদের অজ্ঞতা, বর্ণবাদী মানসিকতা, ঔপনিবেশিক মানসিকতার প্রমাণ। ইতিহাসের সত্য যতই তেতো হোক, সেই সত্য প্রকাশ এবং এই অপরাধগুলোর প্রায়শ্চিত্তের দায়িত্ব আমাদের সবার।