অ্যান্টিবায়োটিক-এর অপপ্রয়োগ - কেন অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করছে না | Superbug | Think Bangla

.

আমেরিকাতে সুপারবাগের আক্রমণে প্রতি বছর ২৮ লক্ষ মানুষ আক্রান্ত হন এবং মারা যান প্রায়  ৩৫,০০০ জন। অর্থাৎ, প্রতি ১৫ মিনিটে একজন।বাংলাদেশে ঠিক কতজন এই সুপারবাগ দিয়ে আক্রান্ত  হচ্ছেন তার সঠিক হিসেব না-থাকলেও  ২০১৯ সালে ব্রিটিশ দৈনিক টেলিগ্রাফের একটি প্রতিবেদনে বলছে, বাংলাদেশের হাসপাতালের আইসিইউগুলোতে ৮০ শতাংশ মৃত্যুর কারণই হচ্ছে এই সুপারবাগের ইনফেকশান। এই ভয়ঙ্কর সুপারবাগগুলো কী? কোথা থেকে আসছে এরা? 


সুপারবাগ হচ্ছে এমন সব শক্তিশালী ব্যাক্টেরিয়া যাদের বিরুদ্ধে কোনো এন্টিবায়োটিকই আজ আর কাজ করছে না, এমনকি সবচেয়ে শক্তিশালী এন্টিবায়োটিকগুলোও না। আমরা যত বেশি, যত শক্তিশালী এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করছি রোগ প্রতিরোধের জন্য, ততই ব্যাকটেরিয়াগুলো  বিবর্তনের ধারায় টিকে থাকার জন্য নিজেকে বদলে ফেলছে, এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে ফেলছে, আর তাতে করে উল্টো আবার সম্ভাবনা বাড়ছে নতুন নতুন সুপারবাগ সৃষ্টির।


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৭ সালে ১২ ধরনের এরকম এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধকারী ব্যাক্টেরিয়ার লিস্ট দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এদের দমন করা না-গেলে অচিরেই বিশ্বব্যাপী আরেক ভয়ানক মহামারীর সৃষ্টি হতে পারে। আসুন জেনে নেই, আমরা নিজেরাই কিভাবে এই ঘাতক সুপারবাগগুলো তৈরি করছি এবং এখন আমাদের করণীয় কী। এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধকারী ব্যাক্টেরিয়া বা এই সুপারবাগদেরদের নিয়ে কথা বলার আগে চলুন চট করে দেখে নেই, ব্যাকটেরিয়া কী? ব্যাকটেরিয়া হলো, অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া দেখা যায় না এমনই ক্ষুদ্র আদি এককোষী জীব। পৃথিবীতে এদের বিবর্তন ঘটে আমাদের, মানে মানুষের, অনেক আগে, প্রায় কয়েকশ কোটি বছর আগে। আগ্নেয়গিরির ভিতর থেকে শুরু করে গভীর সমুদ্র, বরফে-ঢাকা পাহাড়ের চূড়া পর্যন্ত সব জায়গায় দিব্যি টিকে থাকতে পারে তারা। 


আপনি কি জানেন আমাদের দেহের ভিতরেও বাস করে কোটি কোটি ব্যাক্টেরিয়া? এদের সংখ্যা আমাদের নিজের দেহকোষের চেয়েও বহুগুণ বেশি। না, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বেশিরভাগ ব্যাক্টেরিয়াই আমাদের কোন ক্ষতি করে না, বরং উপকারই করে: যেমন, আমাদের পাকস্থলীতে খাওয়া হজমে সাহায্য করে, রোগ প্রতিরোধে এমনকি দই তৈরিতেও সাহায্য করে। কিন্তু আবার এমন কিছু  ব্যাকটেরিয়া আছে যারা ভয়ঙ্কর সব রোগও ঘটায় আমাদের দেহে। আর এদের প্রতিরোধের জন্যই তৈরি হয়েছে বিভিন্ন ধরনের এন্টিবায়োটিকের। 


রোগ সৃষ্টিকারী এই ব্যাকটেরিয়ার দেহকে যদি আমরা একটা মেশিনের সাথে তুলনা করি তাহলে এন্টিবায়োটিক হলো সেই অস্ত্র যা সেই মেশিনের কলকব্জাগুলোকে এমনভাবে নিষ্ক্রিয় করে দেয় যে মেশিনটি আর কাজ করতে পারে না। তখন আমরা ঐ রোগ থেকে ধীরে ধীরে সেরে উঠি।

আলেক্সান্ডার ফ্লেমিং ১৯৪৫ সালে এন্টিবায়োটিকের আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরস্কার নেওয়ার সময় বলেন, "এন্টিবায়োটিক অনেক জীবন বাঁচালেও, এর ভুল ব্যবহার থেকে জন্ম হতে পারে ভয়ংকর সব ব্যাক্টেরিয়ার যাদের বিরুদ্ধে কোন এন্টিবায়োটিকই একদিন আর কাজ করবে না"। এবং দুঃখের বিষয়, মাত্র সত্তর পঁচাত্তর বছরেই তাঁর সেই সাবধান বাণীটিই আজ সত্যি হতে চলেছে।  


১৯২৮ সালে তাঁর এন্টিবায়োটিকের আবিষ্কার যে কোটি কোটি মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছে তাইই নয়, সাধারণ কাটাছেঁড়া, সর্দিকাশি, জ্বর থেকে শুরু করে কলেরা, যক্ষ্মা, সিফিলিস, বা মেনিনজাইটিসের মত রোগ প্রতিরোধ করে মানুষের গড় আয়ু বাড়াতেও বিশাল এক ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে আবার জীবনরক্ষাকারী এই এন্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার জন্ম দিচ্ছে মহাশক্তিশালী সব এন্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্ট বা প্রতিরোধকারী ব্যাক্টেরিয়ার বা সুপারবাগের।   যেমন, কিছুদিন আগেও আমরা ভাবতাম পৃথিবী থেকে যক্ষ্মা নির্মূল হয়ে গেছে, অথচ এই যক্ষ্মাই আবার ফিরে এসেছে আরো শক্তিশালীরূপে। 


কেন এবং কিভাবে তৈরি হচ্ছে এই ভয়ংকর সব অপ্রতিরোধ্য সুপার-জীবাণুগুলো? সবচেয়ে শক্তিশালী এন্টিবায়োটিকগুলোও কেন এদের আর রোধ করতে পারছে না? এর অন্যতম কারণ হচ্ছে এন্টিবায়োটিকের ডোজ ঠিকমত শেষ না-করা। ধরুন, আপনাকে কোন ইনফেকশানের জন্য এন্টিবায়োটিক দেওয়া হলো, ৩-৪ দিনের মধ্যেই সুস্থ বোধ করতে শুরু করলেন আর দিব্যি ডোজ কমপ্লিট না করেই ওষুধ খাওয়া ছেড়ে দিলেন। এর ফলে শরীরের বেশিরভাগ ব্যাক্টেরিয়া মরে গেলেও খুব শক্তিশালী কিছু ব্যাক্টেরিয়া, যারা এই এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শক্তি নিয়েই জন্মেছে, তারা কিন্তু দিব্যি টিকে থাকে।

 

 

মানুষের গড় আয়ুর তুলনায় ব্যাকটেরিয়া জীবনকাল খুবই ছোট, যেমন, ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া বাঁচে সাকুল্যে ১৫-২০ মিনিট। তাই খুব কম সময়েই এদের বিবর্তন ঘটতে পারে। আমরা জানি,  মিউটেশনের মাধ্যমে কোনো জনগোষ্ঠীতে অনেক ধরনের ভ্যারিয়েশন বা প্রকরণ সৃষ্টি হয়। যেমন, আমাদের মধ্যে লম্বা, বেঁটে, ফর্সা, কালো, দুর্বল, শক্তিশালী বহু ধরনের মানুষ দেখা যায়। শুধু তাই নয়, ব্যাক্টেরিয়ারা আবার নিজেদের মধ্যে জিন সোয়াপ করেও বংশগতীয়ভাবে বদলে যেতে পারে, যা আমরা পারি না।

 

  

এখন ডোজ শেষ করার আগেই এন্টিবায়োটিক সেবন করা ছেড়ে দেওয়ার ফলে আপনার শরীরে কী হচ্ছে? রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাক্টেরিয়াদের মধ্যের দুর্বল বা মাঝারি শক্তিসম্পন্ন যে-সদস্যেরা ছিল তারা প্রথম ক'দিনেই মরে যাচ্ছে। সবচেয়ে শক্তিশালীগুলো কিন্তু এখনো মরেনি। এর ফলে শক্তিশালী ব্যাক্টেরিয়াগুলোই প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় নতুন পরিবেশের সাথে  যুদ্ধ করে, অভিযোজিত হয়ে টিকে যাচ্ছে এবং বংশবৃদ্ধি করছে এবং তৈরি হচ্ছে একের পর এক শক্তিশালী সব ব্যাক্টেরিয়া। এদের দমন করতে হলে পরবর্তীতে প্রয়োজন পড়ছে আরো শক্তিশালী এন্টিবায়োটিকের। এবার আসি দ্বিতীয় কারণে। এন্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার। 


 

কেবলমাত্র উন্নয়নশীল দেশগুলোতেই নয়, উন্নত দেশগুলিতেও প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে এন্টিবায়োটিক দেওয়া হয় ছোটোখাটো জ্বর, কাশি, সর্দিতেই, এমনকি, অযথাই ফ্লুর মত ভাইরাল ইনফেকশনেও। এন্টিবায়োটিক কিন্তু ভাইরাস ধ্বংস করতে পারে না, শুধু ব্যাক্টেরিয়াই মারতে পারে। এক আমেরিকাতেই, এত কড়াকড়ি সত্ত্বেও, বিনা কারণেই, ৫ কোটিরও বেশি এন্টিবায়োটিকের প্রেস্ক্রিপশন দেয়া হয়, প্রতি বছর। এভাবে যখনতখন এন্টিবায়োটিক খাওয়ার ফলে আমাদের শরীরের বহু উপকারী এবং রোগ সৃষ্টিকারী (এটা কি ঠিক নাকি রোগপ্রতিরোধকারী হবে??) সাধারণ ব্যাক্টেরিয়াগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এবং টিকে থাকছে শুধু শক্তিশালী ব্যাক্টেরিয়াগুলোই।


 

অন্যদিকে পশুপাখির ফার্মগুলিতে রোগ প্রতিরোধ এবং কৃত্রিমভাবে ওজন বাড়ানোর জন্য  পশুখাদ্যে এন্টিবায়োটিক যোগ করা হয়। এতে করেও প্রতিনিয়ত এন্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার জন্ম হচ্ছে। ওই মাংস, ডিম, দুধ খেলে পরে আমাদের দেহেও চলে আসছে সেই শক্তিশালী ব্যাকটেরিয়াগুলো। আজকে সারা পৃথিবীব্যাপী হাসপাতালগুলো এন্টিবায়োটিক-রেসিস্ট্যান্ট সুপারবাগদের ডিপোতে পরিণত হয়েছে।  

 

 

 

 

 

এই চার্টে দেখুন Methicillin-resistant Staphylo-coccus aureus বা MRSA-এর মত ভয়ঙ্কর ব্যাকটেরিয়াগুলো সময়ের সাথে সাথে কতটা রেসিস্ট্যান্ট হয়ে উঠেছে। এগুলোকে খুব উচ্চ শক্তিসম্পন্ন এন্টিবায়োটিক দিয়েও আর ঠেকানো যাচ্ছে না। অনেক বিজ্ঞানীই সাবধানবাণী উচ্চারণ করছেন যে, এভাবে চলতে থাকলে, অচিরেই এরকম কোন সুপারবাগ থেকে বিশাল কোন মহামারী দেখা দেওয়া অসম্ভব নয়। এখন তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা একে কিভাবে প্রতিরোধ করতে পারি? ডাক্তারের দেওয়া এন্টিবায়োটিক কোর্স পুরোপুরি শেষ করতে হবে। অর্ধেক কোর্স চলাকালীন সময়ে বন্ধ করে দেওয়া যাবে না। একটু ঠান্ডা জ্বরেই ফার্মেসি থেকে কিনে বা অন্য কারোর জন্যে প্রেসক্রাইবড এন্টিবায়োটিকও সেবন করা যাবে না।


 

আমরা আজকাল ওধুষ খেতে এত অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে প্রাকৃতিক নিয়মে অনেক ইনফেকশান যে ভালো হয়ে যায়, সেটাই যেন ভুলে যাই। ডাক্তারদের মুড়িমুড়কির মত এই এন্টিবায়োটিক প্রেস্ক্রাইব করা বন্ধ করতে হবে। হাসপাতালগুলোতে এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমাতে হবে, বন্ধ করতে হবে পশু খামারগুলোতে এর ব্যবহার। ওষুধ প্রশাসনের শক্ত হাতে এগিয়ে আসতে হবে এই অপব্যবহার রোধে। পৃথিবীব্যাপী বড় বড় ওষুধ কোম্পানিগুলো আজ আর এন্টিবায়োটিকের গবেষণায় বিনিয়োগ করছে না, মুনাফা হয় না বলে। অথচ আরেক মহামারী বা এমনকি অতিমারী থেকে মানব সভ্যতাকে রক্ষা করতে হলে সার্বিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া দরকার আজই। প্রয়োজন নতুন নতুন গবেষণার। চিকিৎসা এবং ওষুধ তৈরিতে শুধু মুনাফা নয়, গণস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে না পারলে এধরনের সমস্যাগুলোর সমাধান সম্ভব নয়। তবে শুধু সরকার বা কর্তৃপক্ষ নয়, আমাদের নিজেদেরও আজ বোঝা দরকার ব্যাক্টেরিয়া, ভাইরাস, জীবাণুগুলো ঠিক কিভাবে কাজ করে, বিবর্তিত হয় এবং কেন এন্টিবায়োটিককে গ্র্যান্টেড হিসেবে নিলে উপকারের চেয়ে ক্ষতিই হয় বেশি।

সবচেয়ে বেশি দেখা ভিডিও দেখুন | Most Watched Video

?>

নিবন্ধসমূহ | Articles

A PHP Error was encountered

Severity: Notice

Message: fwrite(): Write of 34 bytes failed with errno=122 Disk quota exceeded

Filename: drivers/Session_files_driver.php

Line Number: 267

Backtrace:

A PHP Error was encountered

Severity: Warning

Message: session_write_close(): Failed to write session data using user defined save handler. (session.save_path: /home2/thinksc5/public_html/application/cache)

Filename: Unknown

Line Number: 0

Backtrace: