বেড়ালের আত্মীয় বাঘ

.

নিবন্ধ

পরিবেশ ও প্রকৃতি | Environment

বেড়ালের আত্মীয় বাঘ

হালুম!
বাঘ! ব্যাঘ্র! বনের রাজা! 

বাঘ শব্দটি শুনলে কারো মনে হয়তো জেগে ওঠে রোমাঞ্চ, কেউবা হোন ভীত, কেউবা ভেবে বসেন ওহ বাঘ! ও আর এমনকি! বাঘের মাসি তো আমাদেরই ঘরের বেড়াল! 

বাঘ নিয়ে দেখুন থিংকের ভিডিও বাঘ কেন বিলুপ্ত হচ্ছে?

সে খুব একটা ভুল নয় মোটেই, বাঘ আসলে বেড়ালের মতই, বেড়ালের খুব কাছেরই আত্মীয়। বাঘ আর গৃহপালিত বেড়াল দুইই আরো ৩৮খানা প্রজাতির মতই একই পরিবারের সদস্য! সে পরিবারটির নাম ফেলিডে।

শুনলেই মনে পড়ে রূপকথার বাঘের গল্পগুলো। কিংবা সেই ছড়ার পংক্তি, বেড়াল হল বাঘের মাসি। বাঘ নিয়ে বাগধারাও কম নেই আমাদের। 

বাঘ আর মানুষ! সম্পর্কটা জটিলই বটে। শত শত বছর ধরে, রাজকীয় এই প্রাণীর প্রতি ভয়, ভালোবাসা দুটোই ছিল আমাদের, আবার শিকার করে এগুলো প্রায় বিলুপ্ত করে ছেড়েছি আমরা। 

বাঘের সাথে মানুষের সম্পর্ক একটু জটিল, ঠিক যেমনটি বললাম প্রথমেই। বাঘ আর মানুষ একে অপরকে অনেক সময়ই বেশ ভয়ই পায়! শুনতে খুব অবাক শোনাচ্ছে, তাই না? কিন্তু মানুষ পৃথিবীতে একক রাজত্ব শুরু করার আগ পর্যন্ত বাঘ মেরেছে অজস্র মানুষ, কখনো ভয় থেকে, কখনোবা খাবার জন্য, কখনো নিতান্তই বিরক্ত হয়ে। আর মানুষ যেদিন থেকে বারুদ আর বন্দুক হাতে পেল সেদিন থেকে বাঘেদের দফারফা শুরু হলো। এর পাশাপাশি ক্রমেই বেড়ে-চলা মানুষের সংখ্যার কারণে মানুষকে জায়গা করে দিতে গিয়ে শেষ হতে লাগল বাঘের আবাস। ক্রমশই কমে আসতে শুরু করল বাঘের বেঁচে থাকার অবলম্বন। 

গত শতকের শুরুতে বাঘ যে পরিমাণ জায়গা জুড়ে ছিল সেই তুলনায় তারা এখন মাত্র ৬ শতাংশ ভূমিতে থাকে, এশিয়া মহাদেশের মাত্র ১০টি দেশে টিকে আছে এরা। 

বাঘেরা কিন্তু আসলেই বেড়ালের আত্মীয়, ‘বড় বেড়াল’, আপনার জানলার কাচে যাদের হাই তুলতে দেখেন বা শিকার করে বেড়াতে দেখেন রাস্তাঘাটে। কুকুরেরা ডালভাত খেয়ে সানন্দে থাকলেও বেড়ালেরা কিন্তু প্রায় পুরো মাংসাশী। মাংস ছাড়া তাদের চলবেই না, মারাও পড়তে পারে তারা।

বুনো বেড়ালের প্রজাতি আছে প্রায় ৪০টা, বর্গ বা অর্ডারের নাম কার্নিভোরা। এরমধ্যে প্যান্থেরা গণ বা জিনাসের অন্তর্গত পাঁচটা ধরা হয় ‘বড়’ বলে-সিংহ, চিতাবাঘ, তুষার চিতা, জাগুয়ার আর আমাদের  বাঘমামা।

আর এই বাঘেদের মোট নয়টি উপপ্রজাতির মাঝে পাঁচটি উপ-প্রজাতি টিকে আছে। তিনটি গেছে বিলুপ্ত হয়ে। আরেকটা হারিয়ে গেছে বন থেকে, কেবল চিড়িয়াখানাতেই দেখে মেলে এদের। দুনিয়ার সবচে বেশি বাঘের আখড়া ভারতে। এই বাঘেরা থাকার জায়গা নিয়ে বিশেষ বাছবিচার করে না। পৃথিবীর প্রায় সবরকম পরিবেশেই এদের দেখা মেলে, সে হোক তুষারঢাকা পাহাড় কিংবা জলাভূমি বা গহিন অরণ্য। খুব বেশি গরম বা বেশি ঠান্ডা হোক, কিংবা প্রচুর বৃষ্টির এলাকা বা একেবারে শুকনো জায়গা, কোথাও এদের থাকতে সমস্যা নেই। তবে সংখ্যায় এরা বেশি থাকে পলিমাটির ঘাসজমিতে। পাহাড়ি এলাকা বা বৃষ্টিবনে এরা থাকতে পারে তবে বংশবৃদ্ধির হার হয় কম। 


নানা বাসভূমিতে তাদের দেহের মাপও বদলায়, যেমন নেপাল, উত্তর ভারত আর দূর পূর্ব রাশিয়ার বাঘেরা আকারে সবচে বড়মাপের, আর সুন্দরবনের বাঘ, আমাদের পরিচিত প্রাণীটি, মাপে সবচে ছোটো। ধারণা করা হয় মূলত তাদের শিকারেরা কত বড়, তার ওপর নির্ভর করেই তাদের দেহের মাপের হেরফের হয়।


অরণ্যে প্রায় বছর পনেরোর মত বাঘের আয়ু হয়। তারা একাই ঘুরে বেড়ায়, তবে একেবারে নিঃসঙ্গ তারা  নয়। নারী আর পুরুষ বাঘ জটি বাঁধে মিলনঋতুতে, কখনো কখনো তারা বাচ্চা বড় করে দুজন মিলেই। বাঘিনী সাধারণত ৪টি শাবকের  জন্ম দেয়। প্রায়ই দেখা যায় ছানাদের মধ্যে ছেলেমেয়ে সমান সমান সংখ্যায় থাকে। বছর দুয়েক বয়েস অবধি বাচ্চাগুলো মায়ের সাথে সাথেই থাকে, বড় হয়ে উঠলে মায়ের এলাকা ছেড়ে বেরিয়ে আসে তারা। ছেলে বাচ্চাগুলো নিজেদের জিনবৈচিত্র্য ধরে রাখতে গিয়ে যতদূর যেতে পারে যায়, মেয়ে বাচ্চাগুলো থাকে মায়ের গা ঘেঁষে। মায়ের এলাকা বেশি হলে মেয়েদের কিছু জায়গা ছেড়ে দেয় যাতে তারা নিজের রাজ্য তৈরি করে নিতে পারে


আগেই যেমনটা বলছিলাম, গত শতকের শুরুতে  লাখখানেক বাঘ দিব্যি ঘুরে বেড়াত প্রায় পুরো এশিয়া জুড়ে। কিন্তু ঠিক তখনই  উপনিবেশী ভারতে ব্রিটিশ আর অভিজাত সমাজে বাঘশিকার ছিল “স্পোর্টস”  —একেকজন মহারাজা বা ইংরেজ শিকারি গর্ব করতেন যে তাঁর শিকারের জীবনে তিনি বাঘমারায় সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন। 

এখন তিন থেকে চার হাজারে গোঁত্তা মেরে নেমে এসেছে বাঘেদের  সংখ্যা। এর অর্ধেকেরও বেশি ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’ যাদের ঘরবাড়ি হল বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, নেপাল আর মায়ানমারে। এই ‘রয়েল’ নামটা যদিও বৈজ্ঞানিক কিছু নয় বরঞ্চ ঔপনিবেশিক রোমান্টিসিজম।  মানব সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিকতা আর পুরাণে বাঘেরা জায়গা করে নিয়েছে, বোধকরি আর কোন প্রাণীই সেভাবে করতে পারেনি। 

যিশুর জন্মের শপাঁচেক বছর আগে কনফুসিয়াস লিখে গেছেন তাদের হিংস্রতা নিয়ে, আধুনিক চিনে তারা শক্তিমত্তা, মানসিক বল আর সৌভাগ্যের প্রতীক। পৃথিবীর সবচে বড় বাদাবন সুন্দরবনের গভীরে লোকজন শ্রদ্ধায় আর ভয়ে তাদের ডাকে ‘মামা’ বলে’। সুন্দরবন এলাকার পৌরাণিক কাহিনিতে বাঘের নাম ‘দক্ষিণ রায়’, তার হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করেন বনবিবি, বনের দেবী। হিন্দুমুসলিম সবাইই এই লৌকিক কাহিনিতে বিশ্বাসী। বাঘ এখন বাংলাদেশের জাতীয় পশু, সাথে আমাদের ক্রিকেট দলের প্রতীকও। রাশ্যার পূর্বদিকে উদেগে গোত্র বাঘকে ডাকে আম্বা মানে শ্রদ্ধাভাজন। নানান খেলোয়াড়ি দল, বিয়ার, তেল এসবের প্রতীক হিসেবেও বাঘ ব্যবহৃত হয়েছে।

নেটফ্লিক্সের তুমুল জনপ্রিয় ওয়েব সিরিজ ‘টাইগার কিং’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাঘ প্রজননকারীদের উদ্ভট কাণ্ডকারখানা নিয়ে বানানো। দুনিয়ার বনে যত বাঘ আছে তারচে বেশি আছে তাদের খাঁচায়। এরকম তথাকথিত ‘রাস্তার ধারের চিড়িয়াখানা’-য় আদুরে বাঘের ছানা নিয়ে ছবি তুলতে আপনার শখানেক ডলার খসতে পারে, আর বেশিরভাগ অঙ্গরাজ্যেই ঘরে বাঘপোষার বিরুদ্ধে কোনো আইন নেই। কিন্তু এই টাকা সত্যিকারের বুনো বাঘ রক্ষায় কোন অবদানই রাখে না।

বাঘের ভীতি থাকার পরেও কিংবা হয়তো তার কারণেই পুরস্কার হিসেবে, ছালের জন্যে কিংবা অঙ্গের জন্যে বাঘ চোরাশিকার করা হয়। এই অঙ্গের মধ্যে বাঘের পুরুষাঙ্গও বাদ যায় না, প্রথাগত চিনে চিকিৎসা পদ্ধতিতে এটা পুরুষদের যৌনশক্তি বাড়ানোর ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। নামকরা যৌনশক্তিবর্ধক ওষুধ ভায়াগ্রা এসেছে বাঘের সংস্কৃত প্রতিশব্দ ব্যাঘ্র থেকে।

নিজের সীমানার ভেতর বাঘ হারাচ্ছে নিজস্ব আবাস আর কমছে তাদের খাবারের পরিমাণ ও সংখ্যা। এতে করে তারা জনবসতিতে হামলে পড়ছে আর সাবাড় করছে গবাদি পশু। নিজেদের জীবন আর জীবিকা বাঁচাতে মানুষও বৈরি হয়ে বাঘ মারছে। বাঘের আবাস আর মানুষের জীবিকা কমিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনও হয়তো এই দুর্দশা আরো বাড়িয়ে তুলছে।


সবচেয়ে বেশি দেখা ভিডিও দেখুন | Most Watched Video

?>

নিবন্ধসমূহ | Articles