বাঘ
বাঘ। শুধু প্রাণী নয়। আমাদের জাতীয় এবং সামাজিক জীবনে মিশে থাকা বীরত্ব এবং সাহসের প্রতীকও। তবে বাঘের ডেরা যেই জঙ্গলে সেই সুন্দরবনে কিন্তু ব্যাপারটি অন্যরকম। সুন্দরবন অঞ্চলে বাঘকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা হয়।
বাঘ নিয়ে দেখুন থিংকের ভিডিও বাঘ কেন বিলুপ্ত হচ্ছে?
সুন্দরবন অঞ্চলের লোককথায় বাঘকে দেখা হয় অপশক্তির প্রতীক হিসেবে। সেখানে বাঘের রাজা দক্ষিণরায় হচ্ছেন অপশক্তির প্রধান প্রতীক এবং সুন্দরবন অঞ্চলের ভিলেন। হিরো'র চরিত্রে আছেন বনবিবি। একসময় দক্ষিণরায়ের সাথে বনবিবি'র ভীষণ যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে দক্ষিণরায় হেরে যান। তাঁর জায়গা হয় গহিন বনে। একদিন দুইজন মৌয়াল ধোনাই এবং মোনাই মোম সংগ্রহ করতে গহিন বনে যাওয়ার কথা চিন্তা করেন। সাথে নিয়ে যান তাঁদের ভাতিজা দুঃখে-কে। দুঃখে'র মা দুঃখে'কে বলেন, "বনে আমার মতন তোর আরেক মা আছেন, কোন বিপদে পড়লে তাঁকে ডাকবি।" গহিন বনে দক্ষিণরায় ধোনাই-মোনাই'য়ের কাছে দুঃখে'কে বলি চায়। ভয়ে ধোনাই-মোনাই দুঃখে কে ফেলে চলে যায়। দুঃখ বনের মা বনবিবিকে স্মরণ করে বাঘের রাজা দক্ষিণরায়ের হাত থেকে রক্ষা পায়। সেই থেকে সুন্দরবনের "গার্ডিয়ান স্পিরিট" হিসেবে বনবিবি বিবেচিত হয়ে আসছেন।
মানুষের হাতে অসংখ্য বাঘের মৃত্যুর পেছনে এই ডেমোনাইজেশন কতটা ভূমিকা রেখেছে তা বিতর্কের বিষয়। তবে এই ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই যে, বাঘ একটি অনন্যসাধারণ প্রাণী এবং এটি হুমকির মুখে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফির মতে ১০০ বছর আগেও পৃথিবীতে বাঘের মোট আটটি প্রজাতি ছিলো। কেবল গত শতাব্দীতেই এর তিনটি প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বাকি পাঁচ প্রজাতি মিলে বাঘের সংখ্যা মাত্র কয়েক হাজার।
বর্তমানে পৃথিবীতে যত বাঘ আছে তাঁর প্রায় অর্ধেকই হচ্ছে বেঙ্গল টাইগার। ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান এই অঞ্চলেই এর বেশি দেখা পাওয়া যায়। বর্তমানে প্রায় আড়াই হাজার বেঙ্গল টাইগারের মধ্যে বাংলাদেশের সুন্দরবনে ১১৪ টি এবং ভারতের সুন্দরবনে ৮৪ টি বাঘ রয়েছে।
বেঙ্গল টাইগারের মধ্যে সুন্দরবনে যারা রয়েছে তাদের টিকে থাকার ক্ষমতা অন্যদের চাইতে বেশি এমনই বলছেন বিজ্ঞানীরা। কারণ, যেই সুন্দরবন বলতে প্রথমেই আমাদের মাথায় বাঘের চিন্তা চলে আসে, সেটি নাকি আসলে বাঘের বসবাসের জন্য একেবারেই উপযুক্ত নয়। হ্যাঁ, এমনটিই উঠে এসেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাজ্যের কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন গবেষকের গবেষণা থেকে। গবেষণা প্রবন্ধটি জার্মানির "এনডেঞ্জারড স্পেসিস রিসার্চ" নামের আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকীতে অক্টোবর ২০২০-এর শুরুতে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়:
১। জিনগত বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে সুন্দরবনের বাঘের তিনটি ধরণ (হ্যাপ্লোটাইপ) আছে। এর কারণেই ৩০০ বছর ধরে সুন্দরবনের জলা ও কাদাময় পরিবেশে এরা টিকে আছে।
২। জলাভূমি ও কাদামাটির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সুন্দরবন বেঙ্গল টাইগারের বসবাসের উপযুক্ত নয়। ২৫০-৩০০ বছর আগে বাংলাদেশের শুষ্ক ভূ-ভাগ থেকে সুন্দরবনে গিয়ে এরা বসবাস শুরু করে।
৩। ভারতের আসামের কাজিরাঙা বা উত্তরাখণ্ডের সংরক্ষিত করবেট বনভূমির বাঘের চাইতে সুন্দরবনের বাঘ আকৃতিতে ছোটো হয়। কারণ ওইসব শুষ্ক অঞ্চলের বনে বাঘের জন্য বড় আকৃতি প্রে এনিম্যাল বা শিকারযোগ্য প্রাণী বেশি থাকে যা সুন্দরবনে জলা ও কাদাযুক্ত বনভূমিতে নেই।
৪। সুন্দরবনে বাঘের খাদ্যসংকট আছে। বাঘের মল পরীক্ষা করে দেখা গেছে সাতক্ষীরা রেঞ্জে বাঘের খাবারের ৫০ শতাংশ হরিণ থেকে এবং ৫০ শতাংশ শূকর ও অন্যান্য উৎস থেকে আসে। আর খুলনা-বাগেরহাট রেঞ্জে ৭০ শতাংশ হরিণ থেকে এবং ৩০ শতাংশ শূকর ও অন্যান্য উৎস থেকে আসে। আশংকার ব্যাপার হচ্ছে, বাঘের মাছ ও কাঁকড়া খাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বাঘ সাধারণত মাছ, কাঁকড়া, গুইসাপ বা অন্যান্য জলজ প্রাণী খায় না। এর কারণ হতে পারে মাংসল প্রাণীর কমে যাওয়া। একটি পরিণত বাঘ এক বসায় প্রায় ৬০ পাউন্ড মাংস খেতে পারে। অর্থাৎ, বাঘের খাদ্য সংকট কমাতে বনে মাংসল প্রাণী বাড়াতে হবে।
গবেষণার ফলাফলের ৪ নম্বর পয়েন্টটার সাথে হরিণ কমে যাওয়া সম্পর্কযুক্ত। চোরাশিকারিদের হাতে বছরে প্রায় ১১ হাজার হরিণ মারা পড়ছে। যা সত্যিই উদ্বেগজনক।
প্রাকৃতিক খাদ্যের সঙ্কট দেখা দিলে বা দুর্বল হয়ে পড়লে বাঘের মানুষখেকো হয়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা হয়। সব বাঘ মানুষখেকো হয় না। মানুষখেকো বাঘ শতকে সর্বোচ্চ একটা। মানুষখেকোর সাথে সাধারণ বাঘের পার্থক্য বোঝার জন্য সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ খসরু চৌধুরীর লেখা থেকে উদ্ধৃত করছি -
"বাঘের মনস্তত্ত্ব এখনো মানুষ আবিষ্কার করতে পারেনি। তবে কিছু আচরণের খোঁজ পেয়েছে। মানুষখেকো বাঘ যদি জঙ্গলের আড়ালের মানুষের সাড়া পায় (মানুষের সাড়া পরিষ্কার বুঝতে পারলে), তাহলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষটি মারা পড়ে। বাঘটি মানুষখেকো না হলে এবং লোকালয়ের আশপাশে চলাচলে কিছুটা অভিজ্ঞ হলে গাছপালার আড়াল নিয়ে কিছুটা এগিয়ে এসে স্বাভাবিক ঔৎসুক্যে দেখতে চায়, কে এল।
কিন্তু জঙ্গলের পথে মানুষ ও বাঘের সামনাসামনি দেখা হয়ে গেলে পরিস্থিতি অন্য রকম হয়-বাঘ কিছুতেই পিছু হটবে না। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে। অপছন্দ হলে লেজ নাড়বে-ধমকানো হাঁক দেবে। বাচ্চা সঙ্গে থাকলে কিছুটা এগিয়ে আসবে, আবার পেছাবে। বাঘ তার মারা জীবজন্তু পাহারায় থাকলেও একই কাজ করবে। এসব ক্ষেত্রে মানুষের সংখ্যা এক বা দুই-বাঘ বিরক্ত হয়ে তাকে বা তাদের মেরেও ফেলতে পারে।
মানুষখেকোর চালচরিত্র একেবারে আলাদা। কোনোক্রমে চোখ পড়ে গেলেও সে সঙ্গে সঙ্গে আড়াল খুঁজে নেবে। তারপর নিজেকে আড়াল করে মানুষ ধরার চেষ্টা করবে।"