সুপারবাগ - নতুন বিপদ?
"এন্টিবায়োটিক" নামটির সাথে আমরা সকলেই কমবেশি পরিচিত। এন্টিবায়োটিক মূলত একধরণের ওষুধ বা মেডিসিন, যা ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত মানুষসহ অন্য প্রাণিদেহে ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধের কাজ করে৷ এটি সুনির্দিষ্ট কোনো ওষুধের নাম নয়।
স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিং ১৯২৮ সালে প্রথম এন্টিবায়োটিক আবিষ্কার করেন (এ আবিষ্কারটি ১৯২৯ সালে "ব্রিটিশ জার্নাল অব এক্সপেরিমেন্টাল প্যাথোলজি"-তে প্রকাশিত হয়)। পেনিসিলিয়াম নামক ব্যাকটেরিয়া থেকে প্রাপ্ত তরল নির্যাস বা রস থেকে তৈরি বলে তিনি এর নাম দিলেন "পেনিসিলিয়াম"। এই আবিষ্কারের জন্য তিনি ১৯৪৫ সালে নোবেল পুরস্কার পান। এরপর থেকেই বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়াঘটিত রোগ দমনে পেনিসিলিয়ামের কার্যকারিতা লক্ষ্য করা যায় এবং এন্টিবায়োটিক নিয়ে গবেষণার দ্রুত অগ্রগতি ঘটতে থাকে।
এন্টিবায়োটিক মূলত প্রাণিদেহে ব্যাকটেরিয়ার বংশবিস্তারের প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি করার মাধ্যমে একে নির্মূল করে। বর্তমানে ব্যাকটেরিয়াঘটিত বহু জীবনঘাতী রোগ নিরাময়ে বিভিন্ন ধরণের এন্টিবায়োটিক ফলপ্রসূভাবে প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু মুদ্রার অন্য পিঠেই ধীরে ধীরে আরেক নতুন বিপদ চিত্রিত হচ্ছে, যার নাম "সুপারবাগ"(Superbug)। ইতোপূর্বে বলা হয়েছে এন্টিবায়োটিক প্রয়োগে বহু ব্যাকটেরিয়াঘটিত রোগ নিরাময় সম্ভব। কিন্তু ব্যাকটেরিয়া একটি অতিদ্রুত প্রজননশীল জীব, গড়ে ৪-২০ মিনিটের মধ্যে এরা সংখ্যায় দ্বিগুণ হতে পারে। অর্থাৎ ব্যাকটেরিয়া খুব দ্রুত একেকটি নতুন প্রজন্ম তৈরি করতে পারে। সৃষ্ট নতুন প্রজন্মে নতুন নতুন বৈশিষ্ট্যের আবির্ভাবও দ্রুত ঘটতে থাকে, যা মাইক্রোবিবর্তনের(Microevolution) এক সুস্পষ্ট উদাহরণ। কোনো ব্যাকটেরিয়া আক্রান্ত জীবদেহে প্রয়োগকৃত এন্টিবায়োটিকের প্রতি যদি ওই ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী হয়ে ওঠে অর্থাৎ নতুন প্রজন্মে ব্যাকটেরিয়াটি এন্টিবায়োটিক সহনশীল বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে সক্ষম হয়, তখনই ওই ব্যাকটেরিয়াকে "সুপারবাগ" হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। পরবর্তীতে একই এন্টিবায়োটিক ওই সুপারবাগ ব্যাকটেরিয়ার বংশবিস্তারে আর কোনো প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয় না।
সিডিসির (Centre for Disease Control & prevention - CDC) রিপোর্ট অনুযায়ী মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ টি সুপারবাগকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে ; যেগুলোকে ভয়াবহতার মাত্রা অনুযায়ী Urgent, Serious এবং Concerning threats এই তিনটি ধরণে বিভক্ত করা হয়েছে। সুপারবাগ যে ধরণেরই হোক না কেন, এর আক্রমণের দুটি ধরন আছে। একটির ক্ষেত্রে আক্রমণের পর কোনো লক্ষণ প্রকাশিত হয় না এবং দ্বিতীয়টিতে প্রকাশিত হয়। সাধারণত যেসব লক্ষণ প্রকাশিত হয় তাদের মধ্যে জ্বর, সর্দিকাশি, অবসাদ, ডায়রিয়া, গা ব্যথা এসব উল্লেখযোগ্য।
তবে বলাই বাহুল্য, প্রথমটি অধিকতর ভয়াবহ। এর একটি উদাহরণ হল গনোরিয়া। এটি একটি যৌন সংক্রামক রোগ (Sexually Transmitted Disease - STD) যা Neisseria gonorrhoeae নামক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে হয়। ইতোপূর্বে সঠিক সময়ে শনাক্ত করা গেলে সেফালোস্পোরিন (cephalosporin) নামক এক ধরনের এন্টিবায়োটিক উপযুক্ত মাত্রায় প্রয়োগ করলে এ রোগ থেকে মুক্তি মিলত। কিন্তু ইদানিং গনোরিয়ার জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়া এই এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে অনেকখানি প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে এবং এন্টিবায়োটিকটি এর কার্যকারিতা হারাচ্ছে। আপাতত এর বিকল্পস্বরূপ সঠিকভাবে পরীক্ষিত এবং কার্যকরী এন্টিবায়োটিক খুব কমই অবশিষ্ট রয়েছে, যার ফলে গনোরিয়া প্রতিরোধের চিকিৎসা ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠছে।
সুপারবাগ নামক এই বিপদের কারণ আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে আছে। ইদানীং বাংলাদেশের বহু ডাক্তার ও হাতুড়ে ডাক্তার গুরুতর প্রয়োজন ছাড়া বা বিনা কারণেও রোগীকে এন্টিবায়োটিক গ্রহণের পরামর্শ দেন। আবার বহু মানুষ ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই ফার্মেসি থেকে খেয়ালখুশিমতো এন্টিবায়োটিক কিনে সেবন করেন। কিংবা কিছুদিন রোগভোগের সাময়িক সুস্থতা অনুভব করায় ডাক্তারের প্রেসক্রাইব করা এন্টিবায়োটিক সম্পূর্ণ কোর্স অসমাপ্ত রেখে দেন। এই সবকটি কাজই একজন মানুষের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। কারণ, বিনা কারণে গৃহীত এন্টিবায়োটিকের প্রতি যদি দেহের কোনো সুপ্ত ব্যাকটেরিয়া একবার প্রতিরোধী হয়ে ওঠে, তাহলে পরবর্তীতে একই এন্টিবায়োটিক ওই ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে আর কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে না। যার ফলে রোগ আরো সংকটজনক পরিস্থিতিতে চলে যেতে পারে, এমনকি রোগীর মৃত্যুও হতে পারে৷ আমেরিকার (USA) মত উন্নত দেশেও প্রতিবছর এই সুপারবাগ ইনফেকশনের শিকার হন ২.৮ মিলিয়ন মানুষ, এবং ৩৫,০০০ এর চেয়েও বেশিসংখ্যক মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। বিশ্বব্যাপী আইসিইউতে সংক্রমণের কারণে মৃত্যুবরণকারী বেশিরভাগ লোকেরই মৃত্যুর কারণ এই সুপারবাগের সংক্রমণ। ২০১৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক (World Health Organization - WHO) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি রিপোর্ট অনুসারে, এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী রোগের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর হার প্রতি বছর ১০ মিলিয়নে গিয়ে দাঁড়াবে, যা ক্যান্সারে মৃত্যুর চেয়েও বেশি। এছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে ২৪ মিলিয়ন লোক কঠোর দারিদ্র্যের মুখোমুখি হবে।
এই অনাগত মহামারির অভিশাপ থেকে বাঁচার উপায় আমাদের হাতেই আছে। সুপারবাগের হাত থেকে বাঁচতে প্রথমেই আমাদের যা করতে হবে তা হল: বিনা কারণে বা তুচ্ছ কারণে এন্টিবায়োটিক সেবন বন্ধ করা। ডাক্তারদের প্রেসক্রিপশন দেওয়ার ক্ষেত্রে সচেতন হতে হবে, পাশাপাশি রোগীরও উচিত ডাক্তারের এন্টিবায়োটিকের কোর্স সম্পূর্ণ করা। সুস্থবোধ করলেই যেন কেউ এন্টিবায়োটিকের কোর্স অসম্পূর্ণ না রেখে দেয়। দৈনন্দিন জীবনযাপনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অবলম্বন করতে হবে, আইসিইউর মত স্পর্শকাতর জায়গায় বিনা কারণে বা প্রটেকশন ছাড়া যাওয়া যাবে না। যথাসময়ে বিভিন্ন রোগের ভ্যাকসিনের আপডেটেড ডোজ নেওয়া জরুরি৷ আবার, গবাদিপশু, হাঁসমুরগি ইত্যাদির ফার্মেও পশুখাদ্যে ইদানিং এন্টিবায়োটিক ব্যবহৃত হয় যা পরবর্তীকালে পশুর মাংস বা পশুর দেহজাত অন্যান্য খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের দেহে চলে আসতে পারে। এবিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। দিনশেষে, প্রথম আর শেষ কথা এটাই, সচেতনতার বিকল্প নেই।