বিষয় অ্যান্টিবায়োটিক: ঘনিয়ে আসছে বিপর্যয়
একসময় দুঃস্বপ্নের জন্ম দেয়া প্রাণঘাতি রোগগুলোকে মামুলি ব্যাপারে পরিণত করা অ্যান্টিবায়োটিকগুলো খুব দ্রুত তাদের কার্যকারিতা হারাচ্ছে। কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে বিশ্বের বড় বড় ওষুধ কোম্পানিগুলোও তাদের অ্যান্টিবায়োটিক গবেষণকদের ছাঁটাই করছে। এর ফলে বড় এক বিপর্যয়ের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞান।
আমাদের শরীরে বাসা বাঁধা অতি পরিচিত কিছু রোগের মূল কারণ ব্যাকটেরিয়া। এসব রোগের মধ্যে ছোটখাটো চর্মরোগ থেকে শুরু করে নিউমোনিয়া, টিবির মতো মারাত্মক রোগও রয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে অ্যান্টিবায়োটিক যুগ শুরুর আগে এই চর্মরোগগুলোর কারণে গোটা অঙ্গ কেটে ফেলতে হতো। সামান্য ঘা গড়াতো মৃত্যুতে। নিউমোনিয়ায় প্রাণহানি ছিল রুটিন বাঁধা ঘটনা। আজকের আধুনিক দেশ অস্ট্রেলিয়ার কথাই ধরা যাক। অ্যান্টিবায়োটিকবিহীন সময়ে প্রতি তিনজন অস্ট্রেলিয়ানের একজনই ৩০ -এর কোঠায় পৌঁছানোর আগেই মারা যেতেন।
শুরুর কথা
১৯২৬ সালে পেনিসিলিন আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে অ্যান্টিবায়োটিক যুগের যাত্রা শুরু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়টিকে ধরা হয় ‘অ্যান্টিবায়োটিক স্বর্ণযুগ’। পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে সত্তরের দশক পর্যন্ত প্রতি বছরই বিপুল পরিমাণ অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার হতে থাকে। আজকে আমরা যে কেমোথেরাপি, ওপেন হার্ট-সার্জারির মতো কিছু অতি পরিচিত সার্জারি অপারেশনের নাম শুনি, তা বাস্তবে পরিণত করা সম্ভব হয়েছে অ্যান্টিবায়োটিকের কারণেই। একসময় চিকিৎসাবিজ্ঞানের গণ্ডি ছাড়িয়ে পশুপালনেও শুরু হয় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার। সেখানেও পাওয়া যায় অভাবনীয় সাফল্য।
অ্যান্টিবায়োটিকের সাফল্যগাঁথা এক নতুন প্রবণতা উস্কে দেয় মানুষের মধ্যে। পশুপালনের সঙ্গে সম্পৃক্তরা দেখেন, মুরগি বা মাছকে যদি দীর্ঘদিন ধরে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো হয়, তাহলে ওজনে এরা সামান্য বাড়ে । শুরু হয় প্রাণরক্ষাকারী এই ওষুধের অতি ব্যবহার। ’৯০-এর দশকের শেষ দিকে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করে দেখতে অস্ট্রেলিয়ার সরকার একটি কমিশন গঠন করে। সেই কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জন টার্নিজ। তাঁর অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি এবিসি নিউজকে বলেন, “যে বিষয়টি অনেকেই বুঝতে পারেনি সেটা হলো, খুব কম মাত্রায় দীর্ঘসময় ধরে একই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের মধ্য দিয়েই আমরা ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে সংগ্রামটি চালিয়ে নিতে পারি।”’
এবিসি নিউজকে দেয়া আরেকটি সাক্ষাৎকারে টার্নিজ বলেন, “যত বেশি অ্যান্টিবায়োটিক নিচ্ছেন, আপনি তত বেশি এর দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছেন। অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা ততই বেড়ে যাচ্ছে আপনার জন্য। এই গোটা প্রক্রিয়াটা কিন্তু সবসময়ই চলছে। ধরুন নানা কাজের মধ্য দিয়ে পরষ্পর ব্যাকটেরিয়া বিনিময় করছি, একজন থেকে আরেকজনে এই অণুজীবগুলো ছড়াচ্ছে। আবার এই জনগোষ্ঠীর মধ্যেই পবিপুল সংখ্যক মানুষ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করছেন। ফলে দেখা যায়, শেষ পর্যন্ত দুর্বল ব্যাকটেরিয়াগুলো মারা যায় ঠিকই, যেগুলো ছড়ায় সেগুলো হলো অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া।”
গড়ে ওঠে প্রতিরোধ
ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ থেকে সৃষ্ট রোগ-বালাই সারাতেই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। অ্যান্টিবায়োটিক প্রযুক্তির ব্যবহার যত বেড়েছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ব্যাকটেরিয়ার অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী প্রবণতা। ইংরেজিতে এদের ‘রেসিস্টেন্স ব্যাকটেরিয়া’ বা চলতি ভাষায় ‘সুপারবাগ’ বলা হয়। এর অর্থ হলো সময়ের সঙ্গে ব্যাকটেরিয়া নিজের মধ্যে এমন জীনগত পরিবর্তন আনতে পারে, যে-অ্যান্টিবায়োটিকগুলো আর সেটিকে ধ্বংস করতে পারে না। সাধারণত বহুল ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকগুলোর বিরুদ্ধেই এই প্রবণতা গড়ে উঠে । জেনেটিক মিউটেশিন নামের এই প্রক্রিয়া যে খুব ঘন ঘন হয় এমনও নয়। অ্যান্টিবায়োটিকের বিচক্ষণ ব্যবহারের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা সংগঠন APUA-এর ওয়েবসাইট থেকে জানা যায় প্রতি ১ মিলিয়নে একটি ব্যাকটেরিয়া এমন প্রতিরোধী হয়ে উঠতে পারে। সমস্যাটি হলো ব্যাকটেরিয়া বংশবিস্তারের মাধ্যমে বা অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় আরেকটি ব্যাকটেরিয়াকেও প্রতিরোধী করে তুলতে পারে। ফলে দেখা যায়, অ্যাণ্টিবায়োটিকের ব্যবহার যত বাড়ে, নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীতে প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যাও তত বাড়ে।
অ্যান্টিবায়োটিকের কোন ধরনের ব্যবহারে এই প্রবণতা গড়ে ওঠে? এমন প্রশ্নের জবাবে জন টার্নিজ বলেন, “যে কোনো অপব্যবহার করা হলে, ঔষধ যতদিন ধরে খাওয়ার কথা ততদিন না খেলে, বা ভাইরাসঘটিত রোগের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার করা হলে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। আমাদের ঠাণ্ডাজনিত যত রোগ হয়, তার বেশিরভাগই আসলে ভাইরাসজনিত রোগ। এইসব ক্ষেত্রে অ্যাণ্টিবায়োটিকের ব্যবহার মানে ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য সরাসরি উৎসাহিত করা। আমরা আর দশটা পণ্যের মতো অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাবহার করছি। সবসময়ই একটা আশা আমাদের মধ্যে কাজ করতো যে বিজ্ঞানীরা হয়ত নতুন কোনো সমাধান নিয়ে আসবেন। তবে এবার আর তেমনটি হচ্ছে না ।আমরা এমন একটি দশায় পৌঁছেছি যে এই সুপারবাগদের চিকিৎসা করার মতো কোনো ওষুধ আমাদের কাছে নেই।”
নতুন কোনো অ্যান্টিবায়োটিক আমরা কেনো পাচ্ছি না ?
এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আগে বুঝতে হবে ওষুধ শিল্পের বাজার । ডায়াবেটিক্স বা উচ্চরক্তচাপের ওষুধের কথাই ধরুন। এসব ওষুধের ক্ষেত্রে ব্যবহার নীতিটা হচ্ছে যত বেশি বিক্রি, তত বেশি লাভ। কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিকগুলো তো এভাবে ব্যবহার করা যায় না। এদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ঠিক উল্টো। নতুন কোনো অ্যান্টিবায়োটিক বাজারে আসলে ডাক্তার বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেটাকে তখনই ব্যবহার করতে চান না। যতক্ষণ বর্তমান অ্যাণ্টিবায়োটিক কার্যকর আছে, তখন অন্য কোনো উন্নত অ্যান্টিবায়োটিক করলে ব্যাকটেরিয়াগুলো প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। পুরনো ওষুধগুলো তখন আর কাজ করে না। বাধ্যতামূলকভাবেই নতুন ওষুধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হয়।
আমেরিকার বোস্টন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক কেভিন অটারসন বলেন, “অ্যাপল কোম্পানির কথাই ধরুন। তারা যদি এমন কোনো পণ্য বের করে, যেটা বাজারে চালানোর জন্য বর্তমানে বাজারে থাকা আইফোন মডেলগুলোই অকার্যকর করতে হয়, তাহলে ব্যবসা অবশ্যই কঠিন হয়ে পড়বে।”
এছাড়া সুপারবাগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এখনো তুলনামূলকভাবে কম । যেমন আমেরিকায় সি.আর.ই নামে একধরনের ঘা-জনিত রোগ দেখা দিয়েছে । এগুলো এমন এক ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার দ্বারা তৈরি হয়, যাদের ওপর চলতি অ্যান্টিবায়োটিকগুলো কোনো কাজই করে না। প্রতি বছর সারা দেশে এমন বড়জোর ৯ হাজার রোগী দেখা যায়। বেশিরভাগ রোগীকেই আবার অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়া অন্য কোনো ওষুধ ব্যবহার করে সারিয়ে তোলা যায়। তাহলে অবশিষ্ট যে অল্পসংখ্যক রোগী থাকে, তাদের জন্য ওষুধ আবিষ্কার করা, তৈরি করা এবং সুলভ মূল্যে বাজারজাত করা নিশ্চয় অনেক কষ্টসাধ্য।
আরেকটি বড় কারণ হলো অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার ও সংশ্লিষ্ট খাতগুলোয় বিশেষজ্ঞ ও গবেষকের সংখ্যা খুব দ্রুত কমে যাওয়া। বর্তমানে ওষুধ কোম্পানিগুলোতে কর্মরত এমন গবেষকের সংখ্যা কোনোভাবেই ১৫০০ এর বেশি হবে না।
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডের গবেষক ও অধ্যাপক ম্যাট কুপার বলেন, “অস্ট্রাজেনেকা কিছুদিন আগেই তাদের কয়েকশ’ অ্যান্টিবায়োটিক গবেষককে ছাঁটাই করে সংখ্যাটা নামিয়ে আনলো ১৪-তে। আরেকটি কোম্পানি কিউবিস্ট কিছুদিন আগে বিক্রি হয়ে যায় মের্কের কাছে। তারা তখন ১২০ জন গবেষককে ছাঁটাই করে। প্রতি বছর শত শত গবেষক এই খাত ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। সমস্যার গোড়াটা হলো এই যে, কোম্পানিগুলো এমন ওষুধই তৈরি করবে যেগুলো একই সঙ্গে দামি এবং প্রচুর পরিমাণে বিক্রি করা যায়।” এই পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে কুপার বলেন, “আমাদের ভিন্ন ধরনের মডেল তৈরি করতে হবে । অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের সামাজিক মূল্য অনেক। আমরা ইন্সুরেন্স প্রিমিয়ামের কথা মাথায় রাখতে পারি। ধরুন এমন ব্যবস্থা করা হলো, যে মাল্টি-ড্রাগ সুপারবাগের বিরুদ্ধে যে আরেকটি নতুন অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি করতে পারবেন, তাকে বছর প্রতি ১০০ মিলিয়ন ডলার দেয়া হবে। আবিষ্কারের পরপরই আমাদের এই ওষুধ ব্যবহারের দরকার নেই। আমরা সেগুলোকে ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য রেখে দিতে পারি। মোদ্দা কথা হলো, আমাদের ওষুধ শিল্পের অর্থনীতি নিয়ে ভাবতে হবে, এবং এটা করতে হবে যতটা দ্রুত পারা যায় তত দ্রুত।’
কতখানি সুলভ অ্যান্টিবায়োটিক?
নতুন প্রজন্মের অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার ও সুপারবাগের নিকাশ নিয়ে যেমন ভাবতে হবে, তেমনি মাথায় রাখতে হবে চলতি অ্যান্টিবায়োটিকগুলো যেনো সবার কাছে পৌঁছায়। আমেরিকার বোস্টন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক কেভিন অটারসন বলেন, “সম্প্রতি ল্যানসেটের এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি বছর বিশ্ব বয়স ৫ পেরোনোর আগেই ৪ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি শিশু মারা যায় সহজে নিকাশযোগ্য ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ দ্বারা। অথচ অ্যামোক্সিসিলিনের মতো সস্তা ও সহজলভ্য অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েই তাদের সারিয়ে তোলা সম্ভব ছিলো। আমাদের এইসব কাজই একই সঙ্গে চালিয়ে নিতে হবে, যাদের প্রয়োজন নেই তাদের কাছ থেকে অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে দিতে হবে এইসব পিছিয়ে থাকা মানুষদের হাতে। আবার একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বর্ধনশীল সুপারবাগের সঙ্গে লড়াইয়ের জন্য নতুন অ্যান্টিবায়োটিকও তৈরি করতে হবে।”